সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও মা-বাবার ভোগদখলের অধিকার সুরক্ষিত রাখার নতুন আইনি ব্যবস্থা নিয়ে ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা ও বিশ্লেষণ চলছে। এ আইনের সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গাটি হলো এর ফলে অনেক অভিভাবক আগের তুলনায় জীবদ্দশায়ই নিজেদের সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে দিতে বেশি উৎসাহিত ও নিরাপদ বোধ করতে পারেন।
আর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হতে পারে আরো গভীর। এতে ইসলামের নির্ধারিত মিরাসি সম্পত্তি বণ্টনব্যবস্থা বাস্তবে ধীরে ধীরে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি আছে। কেউ বলতে পারেন, ‘মিরাসের সম্পত্তি মৃত্যুর আগেই নির্দিষ্ট ওয়ারিশদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার সুযোগ তো আগেও ছিল।’ কথাটি ঠিক।
একজন ব্যক্তি জীবদ্দশায় তাঁর নিজস্ব সম্পত্তি হেবা, দান বা বিক্রয়ের মাধ্যমে সন্তান কিংবা অন্য কাউকে দিয়ে দিতে পারতেন। সুতরাং নতুন আইন মৌলিকভাবে এই সুযোগ সৃষ্টি করেছে—বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু নতুন আইনের সম্ভাব্য প্রভাবের জায়গাটি এখানেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত ব্যবস্থায় কোনো পিতা-মাতা জীবদ্দশায় সন্তানকে হেবা করে দিলে বাস্তব একটি ঝুঁকি থেকেই যেত—সন্তান সম্পত্তির দখল নেওয়ার পর সেটি বিক্রি করে দিতে পারে কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিতা-মাতাকেই সেই সম্পত্তির ভোগদখল থেকে বঞ্চিত করতে পারে।
এমনকি সন্তানের হাতে সম্পত্তি তুলে দেওয়ার পর বার্ধক্যে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্বহীন আচরণের আশঙ্কাও অনেকের মনে কাজ করত। ফলে শরঈ ও আইনসম্মতভাবে জীবদ্দশায় হেবা করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক অভিভাবক বাস্তব ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে সে পথে যেতে দ্বিধা করতেন।
নতুন ব্যবস্থায় যদি হস্তান্তরের পরও পিতা-মাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার সুরক্ষিত থাকে এবং সন্তান একতরফাভাবে সেই সম্পত্তি বিক্রি করতে না পারে, তাহলে আগের সেই ঝুঁকি নিঃসন্দেহে অনেকটাই কমে যায়। আর এর স্বাভাবিক ফল হতে পারে অভিভাবকরা জীবদ্দশায়ই সম্পত্তি নির্দিষ্ট সন্তান বা সম্ভাব্য ওয়ারিশদের মধ্যে হস্তান্তর করতে আগের তুলনায় বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবেন। আশঙ্কাটা ঠিক এখানেই।
কারণ ইসলামের মিরাসব্যবস্থা শুধু সম্পত্তি ভাগের একটি পদ্ধতি নয়; এটি আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত একটি অধিকারভিত্তিক বণ্টনব্যবস্থা। কার কতটুকু অধিকার, কোন অবস্থায় কে ওয়ারিশ হবে—এসবের মূলনীতি ইসলামী শরিয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু যদি সামাজিকভাবে এমন একটি প্রবণতা তৈরি হয় যে মৃত্যুর আগেই সম্ভাব্য ওয়ারিশদের মধ্যে সম্পত্তি ‘নিরাপদে’ ভাগ করে দেওয়া অধিক সুবিধাজনক, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে মিরাসের স্বাভাবিক বণ্টনব্যবস্থাই বাস্তবে সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
এতে সমস্যার অবসান হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই; বরং নতুন ধরনের ফিতনা-ফ্যাসাদেরও জন্ম হতে পারে। কে কতটুকু পেল, কে আগে পেল, কে পেল না, পিতা-মাতার জীবদ্দশায় কোন সন্তান কতটা কর্তৃত্ব অর্জন করল—এসব নিয়ে পরিবারের ভেতরে নতুন বিরোধ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ মৃত্যুর পর মিরাসকে কেন্দ্র করে যে বিরোধ দেখা দিত, তার কিছু অংশ হয়তো পিতা-মাতার জীবদ্দশায়ই অন্য রূপে সামনে আসতে পারে।
সুতরাং বলা যায়, নতুন আইনের আশঙ্কার জায়গাটি এই নয় যে জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে; বরং আশঙ্কাটি হলো, আগে যে সুযোগটি ছিল, নতুন আইন সেটিকে আরো নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। এর ফলে এমন একটি সামাজিক প্রবণতা জোরদার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার মাধ্যমে মানুষ স্বাভাবিক মিরাসব্যবস্থার পরিবর্তে জীবদ্দশায় সম্পত্তি বণ্টনকে বেশি পছন্দ করতে শুরু করবে।
এটি শুধু উত্তরাধিকার আইনের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের ভারসাম্য, পিতা-মাতার মর্যাদা, সন্তানদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সামগ্রিকভাবে মুসলিম পারিবারিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ।
আমাদের মুসলিম পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর যেসব মৌলিক প্রতিষ্ঠান যুগের পর যুগ সমাজকে ধরে রেখেছে, সেগুলোর ওপর যখন একের পর এক নতুন আইনি ও সাংস্কৃতিক কাঠামো চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন প্রতিটি পরিবর্তনকে শুধু ‘আধুনিকায়ন’ হিসেবে দেখার পরিবর্তে এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও নৈতিক প্রভাবও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আমাদের দেখতে হবে—এসব পরিবর্তন কি সত্যিই মানুষের অধিকার ও পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, নাকি অজান্তেই এমন একটি সামাজিক কাঠামোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ইসলামের পারিবারিক ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যকারিতা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়বে? অনেকের কাছে এ প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক মুঈনুল ইসলাম, শিক্ষক- দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসা, চট্টগ্রাম
এম