• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

‘মা তুই কেমন আছিস’, মায়ের সঙ্গে শেষ ফোনালাপ


নীলফামারী সংবাদদাতা নভেম্বর ২৪, ২০২২, ০৮:০৪ পিএম
‘মা তুই কেমন আছিস’, মায়ের সঙ্গে শেষ ফোনালাপ

নীলফামারী: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) জগন্নাথ হলের ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে গতকাল বুধবার লিমন কুমার রায় নামে এক শিক্ষার্থী মারা যান। মারা যাওয়ার আগের দিন মঙ্গলবার রাতে তিনি কথা বলেন মায়ের সঙ্গে। খোঁজখবর নেন পরিবারেরও।

মায়ের সঙ্গে শেষ ফোনালাপের সময় তিনি বলেছিলেন, ‘মা তুই কেমন আছিস, ভাই সুমন আর বোন অর্পিতা কেমন আছে, তারা কি ঠিকমতো পড়তে বসেছে।’

নিহত লিমন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের দোলাপাড়া গ্রামের প্রভাষ চন্দ্র রায় ও নীলা রাণী রায় দম্পতির ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় লিমন।

বড় হয়ে ছেলে অনেক বড় মানুষ হবে, ধরবে পরিবারের হাল—স্বপ্ন ছিল বাবার। কমবে তার হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম। তবে ছেলের এমন অকাল মৃত্যুতে সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল প্রভাষ চন্দ্রের।

হল সূত্রে জানা যায়, লিমন হলের সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য ভবনের ৪০২১ নম্বর কক্ষে থাকতেন। গতকাল বুধবার সকালে তিনি ওই ভবনের ছাদে ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন। একপর্যায়ে ছাদ থেকে তিনি লাফ দেন। পরে হলের শিক্ষার্থীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

লিমনের মৃত্যুর খবরের সঙ্গে সঙ্গে শোকের ছায়া নেমে এসে আসে পরিবারে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে শোকের মাতম। মা-বাবা, ভাইবোনসহ স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ। তাদের সেই আহাজারি ছড়িয়ে পড়েছে গোটা গ্রামেও। মেধাবী সন্তান হারোনোর শোক যেন কোনোভাবে বইতে পারছে না পরিবার ও এলাকাবাসী।

মা নীলা রাণী কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথার স্মৃতিচারণ করছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘হামরা ভালো আছি, তুই কেমন আছিস বাবা?’ মায়ের এমন জিজ্ঞাসায় লিমন বলেছিলেন, ‘মা মোর গলাটা কেন বারবার শুকিয়া যাইছে? মোক কেমন ভয় ভয় লাগছে।’

এ সময় তার মা তাকে শরবত খেতে এবং ডাক্তার দেখানোর পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘বাবা মুই পরে কথা কইম, এলা গরু-ছাগল ঘরোত ঢুকাছো।’ কোনোভাবে মানতে পারছেন না এঠাই হবে ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথা।

লিমনের বাবা প্রভাষ চন্দ্র রায় ছেলের মৃত্যুর খবরে ছুটে গেছেন ঢাকায়। মুঠোফোনে তিনি বলেন, ‘ছেলে কইছিল লেখাপড়া শিখি শিক্ষক হোবে। অনেক কষ্ট করিও তার আবদার পূরণ করার চেষ্টা করিছু। ভাবিছিনু ছেলে বড় হইলে সংসারের হাল ধরিবে, মোর কষ্ট হালকা হোবে। কিন্তু মোর সে আশা আর পূরণ হইল না। মোর স্বপ্ন শেষ হইয়া গেইল।’

এলাকাবাসী জানায়, লিমন ছোটবেলা থেকে ছিল মেধাবী। গ্রামের সিংগের গাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করে ভর্তি হয় রংপুরের কারমাইকেল কলেজে। সেখানে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করে সুযোগ পায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির। তার ছোট ভাই সুমন রায় দশম এবং সবার ছোট বোন অর্পিতা রায় পড়ছে পঞ্চম শ্রেণিতে। মা নীলা রাণী রায় গৃহিণী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা প্রভাষ চন্দ্র রায় রিকশা চালিয়ে ও কৃষি শ্রমিকের কাজ করে সংসারসহ সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ।

প্রতিবেশী অনিতা রানী রায় (৪৮) বলেন,‘ প্রভাষ চন্দ্র রায় অনেক কষ্ট করে সংসারসহ তিন সন্তানের লেখাপাড়ার খরচ বহন করতেন। নিজের ভিটে বাড়ির চার শতক জমি ছাড়া আর কোনো জমি নেই তাদের। লিমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার তার পড়ালেখার খরচ জোগাতে তার বাবার কষ্ট আরও বেড়ে যায়। তিনি কখনো রিকশা চালিয়ে, কখনো মানুষের জমিতে কৃষি কাজ করে সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসার চালাতেন।’

লিমনের কাকা নারায়ণ চন্দ্র রায়ের দাবি, লিমন আত্মহত্যা করতে পারে না। কারণ সে নিজেই মানুষকে আত্মহত্যা না করার পরামর্শ দিত।

কিশোরগঞ্জ থানার ওসি রাজীব কুমার রায় বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে কালবেলাকে বলেন, ঢাকায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে সরাসরি পরিবারের কাছে তার মরদেহ পৌঁছাবে। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত মরদেহ বাড়িতে এসে পৌঁছায়নি বলেও জানান তিনি।

সোনালীনিউজ/এম

Wordbridge School