• ঢাকা
  • সোমবার, ০১ মার্চ, ২০২১, ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭

অভিনয় করায় বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন বাবা


নিজস্ব প্রতিবেদক ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২১, ০৯:৩৭ পিএম
অভিনয় করায় বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন বাবা

ফাইল ছবি

ঢাকা: সবকিছু ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন বরেণ্য অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান। রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে বড় ছেলের কবরের পাশে দিয়েছেন চিরঘুম। 

৫ সন্তানের বিশাল পরিবারে প্রাণবিন্দুতে ছিলেন শামসুজ্জামান। সঙ্গে ছিল নাতি-নাতনিরাও। আর এলাকার মানুষদের কাছেও তিনি ছিলেন চোখেরমণি।

তাই সকালে সূত্রাপুর মসজিদে যখন মাইকে ঘোষণা করা হলো, প্রিয় অভিনেতা আর নেই- চারদিকটা হয়ে গেল থমথমে। হাসিমুখে যে মানুষটা সেলফি, কৌতুকসহ নানা কিছুর আবদার পূরণ করে যেতেন, সেই মানুষটাই নেই!

দীর্ঘ ছয় দশকের ক্যারিয়ারে অভিনয়ের জোরেই নিজের নামটিকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পেরেছিলেন এটিএম শামসুজ্জামান। তিনি ছিলেন একাধারে পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সংলাপকার ও গল্পকার। তার লেখা চিত্রনাট্যের সংখ্যা শতাধিক।

অভিনয়ের জন্য আজীবন সম্মাননার পাশাপাশি পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া এটিএম শামসুজ্জামান ২০১৫ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।

এটিএম শামসুজ্জামানের জন্ম ১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর দৌলতপুরে নানাবাড়িতে; বেড়ে উঠেছেন পুরান ঢাকায় দেবেন্দ্রনাথ দাস লেইনে।

বাবা নুরুজ্জামান ছিলেন নামকরা আইনজীবী। তিনি চাইতেন ছেলেও তার মত আইন পেশায় আসুক। কিন্তু শেষে এটিএম শামসুজ্জামান চেয়েছিলেন লেখক হতে। সাংবাদিক রণেশ দাশগুপ্তকে লেখালেখিতে গুরু মানতেন, দৈনিক সংবাদে নিয়মিত তার লেখাও বের হত।

সেই শামসুজ্জামান অভিনেতা হয়ে উঠলেন কীভাবে? দুই বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সেই শৈশব থেকেই মায়ের সঙ্গে সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখতে দেখতে হয়ে উঠেছিলেন সিনেমার পোকা। তখন থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি দুর্বলতা তৈরি হচ্ছিল। সেই তাড়না থেকেই হয়ত অভিনয়ে আসা।

অভিনয় শুরুর পর বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন বাবা। শুরুর দিকে ছিলেন নাটকের প্রমোটার। ২০ টাকা করে পেতেন। সূত্রাপুরের একটি হোটেলে তিন বেলা খেতেন। পরে সিনেমায় যখন নাম করলেন, সেই হোটেলওয়ালা তাকে বলেছিলেন, “আপনাকে দেখে আমার খুব ভালো লাগে। অনেক কষ্ট করেছেন জীবনে।”

১৯৬১ সালে উদয়ন চৌধুরীর বিষকন্যা সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজের সুযোগ মিলে যায়। পরে নারায়ণ ঘোষ মিতার জলছবি সিনেমার জন্য লেখেন চিত্রনাট্য। সেই সিনেমাতেই অভিষেক ঘটে নায়ক ফারুকের।

সিনেমার পর্দায় এটিএম শামসুজ্জামানের অভিনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৫ সালের দিকে। শুরুর দিকে মূলত কমেডি চরিত্রেই তাকে দেখা যেত। ১৯৭৬ সালে আমজাদ হোসেনের নয়নমণিতে খল চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বোদ্ধাদের নজর কাড়েন। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। 

লাঠিয়াল, অশিক্ষিত, গোলাপী এখন ট্রেনে, পদ্মা মেঘনা যমুনা, স্বপ্নের নায়ক সিনেমার শামসুজ্জামান যেমন খল চরিত্রে ফ্রেমবন্দি হয়ে হয়েছেন, রামের সুমতি, ম্যাডাম ফুলি, যাদুর বাঁশি, চুড়িওয়ালায় তার কমেডি চরিত্রের কথাও মনে রেখেছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের দর্শকরা।

ওরা ১১ জন, স্লোগান, সংগ্রাম, সূর্য দীঘল বাড়ি, ছুটির ঘণ্টা, রামের সুমতি, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত, পদ্মা মেঘনা যমুনা এবং গেরিলার মত সিনেমাতেও এটিএম শামসুজ্জামান অভিনয় করেছেন নানা ভূমিকায়। 

অভিনয়ের জন্য এটিএম শামসুজ্জামানের প্রথম পুরস্কার ছিল বাচসাস পুরস্কার। পরে ১৯৮৭ সালে কাজী হায়াতের দায়ী কে সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।

এরপর ১৯৯৯ সালের ম্যাডাম ফুলি, ২০০১ সালের চুড়িওয়ালা, ২০০৯ সালের মন বসে না পড়ার টেবিলে সিনেমায় অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।

২০১২ সালের চোরাবালি সিনেমার জন্য পান পার্শ্বচরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার। আর ২০১৭ সালে ৪২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।২০১৫ সালে পান একুশে পদক।  

চলচ্চিত্রে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার আগে ও পরে টেলিভিশনেও বহু নাটকে দেখা গেছে তাকে। ভবের হাট, রঙের মানুষ, ঘর কুটুম, বউ চুরি ও শতবর্ষে দাদাজান তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। 

সোনালীনিউজ/আইএ