• ঢাকা
  • রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭

ভালোর তরে ভালোবাসা


নিজস্ব প্রতিবেদক ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২১, ১০:১৬ পিএম
ভালোর তরে ভালোবাসা

ঢাকা : ভালোবাসা-যাকে বাঁধা যায় না কোনো দিন, ক্ষণ বা সময়ের শেকলে। তবুও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভালোবাসার বিমূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে ভ্যালেন্টাইনস ডে, ১৪ ফেব্রুয়ারি। আর এই দিবসটিকে বাংলাদেশে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনের কারিগর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শফিক রেহমান। ১৯৯৩ সালের দিকে তিনি এ দেশে ভালোবাসা দিবস উদ্যাপনে সবাইকে উৎসাহী করে তোলেন। তার প্রচেষ্টায় প্রতি বছর এ দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্যাপিত হচ্ছে ভ্যালেন্টানস ডে। তবে বিশ্বে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস উদ্যাপনের ইতিহাসটি আরো পুরোনো।

জানা যায়, ভ্যালেন্টাইনস ডে’র সূচনা হয় আলেকজান্দ্রিয়ার খ্রিস্টান ধর্মযাজক সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের হাত ধরে। এই আধ্যাত্মিক সাধক ও শিক্ষক ১৪৩ সালে ‘বিশপ অব রোম’ পদের একজন শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু তিনি প্রেমে পড়ে যান এক রমণীর। খ্রিস্টধর্মের মূল চেতনা কঠোর তপস্যা ও কৌমার্যব্রত পালনকে তিনি সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। যিশুকে কাছে পাওয়া আর পরকালের সুখের চেয়ে তার কাছে বাসরঘরই ছিল মুখ্য।

জার্মান পণ্ডিত গুয়েবার স্ক্যান্ডেনেভিয়ান অঞ্চলের দেবতা ভ্যালির সম্পর্কে লেখেন, ‘ভ্যালি হচ্ছেন চিরন্তন আলোর উৎস।’ যেমন করে ডিভার হচ্ছে এমন বস্তু যাকে কোনোদিনও ধ্বংস করা যাবে না।

আলোকরশ্মিকে যেমন তির হিসেবে বর্ণনা করা, তেমনই দেবতা ভ্যালিও সব সময় তিরের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। এ কারণে নরওয়েবাসী ফেব্রুয়ারি মাসের ক্যালেন্ডারটিতে ধনুকের চিহ্ন রাখবেই। আর এটির নাম ‘লিয়া-বেরি’ মানে আলো আনয়কারী। এক সময় জার্মানির খ্রিস্টানরা ফেব্রুয়ারি মাসটিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের জন্য উৎসর্গ করে দেশের উপজাতিদের ধর্মীয় আচার পালন থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করতেন। বলা হয়ে থাকে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস দেবতা ভ্যালির মতোই দক্ষ তিরন্দাজ ছিলেন। যারা সুন্দর আগামী উপহার দিতে পারতেন। মানব মনের সব আবেগকে জাগিয়ে দিতেন, বিশ্বের সব প্রেমিক-প্রেমিকাকে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।

পৃথিবীতে কবে থেকে ভালোবাসা দিবসের শুরু তার সঠিক তথ্য জানা নেই। এ নিয়ে প্রচলিত আছে নানা কল্প-কাহিনী ও প্রেম-উপাখ্যান। চায়নাদের ‘দ্য নাইস অব সেভেনস’ এবং জাপানি ও কোরিয়ানদের ‘হোয়াইট ডে’ ভালোবাসাকেন্দ্রিক হলিডে হলেও পশ্চিমাদের বহুজাতিক ‘ভালোবাসা দিবস’ একমাত্র ভালোবাসা দিবস হিসেবে বিশ্বে সাড়া জাগিয়েছে। এটি এখন রীতিমতো সংস্কৃতি। প্রেমিক-প্রেমিকারা কত বিচিত্র পন্থায় ভালোবাসা বা ভালোলাগার প্রমাণ রাখতে চান, তা সত্যিই বিস্ময়কর। উপহারসামগ্রী আদান-প্রদানের দিক থেকে ক্রিসমাসের পরই ভ্যালেন্টাইনস ডে’র স্থান।

অনেকটা লড়াই করে আত্মপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে দিনটি। ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বের কোটি কোটি প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের মনের কথাটি প্রকাশ করে। পারস্পরিক ভালোবাসার হাজারো জাগতিক প্রকাশ ঘটে এ দিনটিতে।

ইতিহাসে রয়েছে, ফেব্রুয়ারির সঙ্গে ভালোবাসা ও উর্বরতার সম্পৃক্ততার প্রমাণটিও নাকি বেশ প্রাচীন। প্রাচীন গ্রিক ক্যালেন্ডারে মধ্য জানুয়ারি থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়টির নাম হয়েছে থ্যামিলিয়ন। আর প্রাচীন রোমে ১৫ ফেব্রুয়ারিকে বলা হতো লিউপারক্যালিয়া। পোপ গ্যালাসিয়াস (৪৯২-৪৯৩) লিউপারক্যালিয়া উৎসব বাতিল ঘোষণা করেন। তবে পোপ ৪৯৬ সালে ঘোষণা দেন, ১৪ ফেব্রুয়ারি সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে পালিত হবে। সেই থেকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে; অর্থাৎ ভালোবাসা দিবসের শুরু।

আধুনিক জ্ঞান বলছে, তিনজন খ্রিস্টান শহীদ ভ্যালেন্টাইনের নামে দিবসটি পালন শুরু হয়। তবে তাদের মধ্যে কে প্রকৃত ভ্যালেন্টাইন ছিলেন এ নিয়ে রয়েছে বিতর্ক; রয়েছে নানামাত্রার আখ্যান।

আখ্যান-১ : রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের সময়কাল; যুদ্ধের জন্য বিশাল সৈন্যবাহিনী প্রয়োজন। যুবকরা কেউ সেনা দলে যোগ দিতে রাজি নন। সম্রাট পড়লেন মহামুশকিলে। হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি আসে-দেশের যুবকরা যেন প্রেম-ভালোবাসায় জড়িয়ে না পড়েন কিংবা বিয়ে করতে না পারেন। তা হলে তারা অবশ্যই সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে রাজি হবেন। ঘোষণা করলেন রাজ ফরমান-‘আজ থেকে যুবকদের বিয়ে নিষিদ্ধ।’ তার এই ফরমানে দেশের তরুণ-তরুণীরা খেপে গেলেন। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামের এক ধর্মযাজকও সম্রাটের এই আইন মেনে নিতে পারেননি। তিনি পাশে এসে দাঁড়ালেন তরুণ-তরুণীদের। তিনি গোপনে প্রেমিক-প্রেমিকাদের বিয়ের ব্যবস্থা করতে লাগলেন। মোমবাতির স্বল্প আলোয় একটি ঘরে বর-বধূ বসতেন। ভ্যালেন্টাইন বিয়ের মন্ত্র পড়াতেন। কিন্তু এ খবর বেশিদিন গোপন থাকেনি। সম্রাট ক্লডিয়াস পুরো ব্যাপারটি জেনে গেলেন। এবং ভ্যালেন্টাইনকে বন্দি করে জেলে পুরলেন। এ খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল দেশের আনাচে-কানাচে। প্রেমিক যুবক-যুবতীদের মধ্যে দেখা গেল বিরূপ প্রতিক্রিয়া। তাদের অনেকেই প্রতিদিন ভ্যালেন্টাইনকে কারাগারে দেখতে আসতেন। তারা তাকে ফুল উপহার দিতেন। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের উদ্দেশে বিভিন্ন উদ্দীপনামূলক কথা বলতেন, যাতে তিনি ভেঙে না পড়েন। এক কারারক্ষীর একজন অন্ধ মেয়ে ছিল। মেয়েটি ভ্যালেন্টাইনকে দেখতে যেতেন কারাকক্ষে। অনেকক্ষণ ধরে তারা দুজন প্রাণ খুলে কথা বলতেন। অন্ধ এ মেয়েটিও নানা কথা শুনিয়ে ভ্যালেন্টাইনকে উৎসাহ দিতেন। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারগুলো আর গোপন থাকল না। ভ্যালেন্টাইনের প্রতি দেশের যুবক-যুবতীদের ভালোবাসার কথা সম্রাটের কানে যায়। এতে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন। ভ্যালেন্টাইনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি। ফাঁসির কাষ্ঠে যাওয়ার আগে ভ্যালেন্টাইন কারারক্ষীর সেই মেয়ের উদ্দেশে তার বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে একটি চিঠি লেখেন। যাতে লেখা ছিল-‘লাভ ফ্রম ইওর ভ্যালেন্টাইন।’ ভ্যালেন্টাইনের ভালোবাসার এ স্মৃতিকে অমর করে রাখার উদ্দেশে সেই থেকে শুরু সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবস পালন।

আখ্যান-২ : ইতালির রোম শহরে ভ্যালেন্টিনা নামে এক সুদর্শন যুবক বাস করতেন। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে তিনি রোমানদের দেবদেবীর পূজা-অর্চনা ত্যাগ করেন। ভ্যালেন্টিনার দেখাদেখি তার অনেক বন্ধুবান্ধবও পূজা-অর্চনা ছেড়ে দেন। ফলে রোমান সম্রাট ক্ষিপ্ত হয়ে ভ্যালেন্টিনাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। ভ্যালেন্টিনার বন্ধুবান্ধবরা তাকে কারাগারে চিঠিপত্র দিয়ে সাহস জোগাতেন। শেষ পর্যন্ত ভ্যালেন্টিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টিনার মৃত্যুদিন। প্রতি বছর এই দিনে তার বন্ধুবান্ধব তাকে স্মরণ করতেন। সেই থেকে ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবসের শুরু বলে অনেকে মনে করেন।

আখ্যান-৩ : ৮২৭ খ্রিস্টাব্দে ভ্যালেন্টাইন নামের এক ব্যক্তি রোমের পোপ নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি চারিত্রিক মাধুর্য এবং সুন্দর ব্যবহার দিয়ে অল্পদিনের মধ্যেই রোমবাসীর মন জয় করে নিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র ৪০ দিন দায়িত্ব পালনের পরই তার জীবনাবসান ঘটে। প্রিয় পোপের মৃত্যুর পর তার স্মরণে ১৪ ফেব্রুয়ারি রোমবাসী এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। অনেকের মতে, এভাবেই ভ্যালেন্টাইনস ডে’র সূচনা।

এসব প্রচলিত গল্প নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। রয়েছে নানাজনের নানামত। তবে গল্প কিংবা বিতর্ক যাই থাকুক, ভ্যালেন্টাইনস ডে এখন আর কোনো নির্দিষ্ট গোত্র বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে পড়েছে তার আবাহন।

ভ্যালেন্টাইনস ডে’র পাশ্চাত্য প্রভাব নিয়ে নাক সিঁটকানো মানুষরাও এদিনে বেশ উদার। অবশ্য ভালোবাসা দিবসের সময়টিই দেশে এতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দিবসটি এমন সময়ে পালিত হয় যখন বাংলাদেশে বসন্ত ঋতুর আবির্ভাব ঘটে। দিনটি আরো উৎসবের আমেজ পায় অমর একুশে গ্রন্থমেলার কারণে। যদিও বৈশ্বিক করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে এবার ভালোবাসার ক্ষণে প্রাণের বইমেলা হচ্ছে না।

তবু ভালোবাসা রং ছাড়াবে। আশাবাদীরা বলেন, দিবসকে ঘিরে কোনো কিছু আবদ্ধ করার কুফল থাকলেও অন্তত এই একটি দিনেও যদি মানুষের মধ্যে শান্তি ও সদ্ভাব ফিরে আসে; তাহলে মন্দ কি?

সব নিয়েই ভালোবাসা চিরন্তন। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অবধি, এমনকি চূড়ান্ত লয়ের পূর্ব পর্যন্ত ভালোবাসা থাকবে। ভুল বলা হল, অনাদিকালই ভালোবাসা থাকবে। দ্বিমত থাকলেও মৃত্যুর পরেও ভালোবাসা আছে; তাই তো পুনরুত্থান। ভালোবাসার হিসাবনিকাশ, পুরস্কার-তিরস্কার।

গ্রন্থের কথার সূত্র ধরে বলা যায়, যুগের ভুল বর্ণনায় অনেকের ধারণা ভালোবাসা শুধুই নারী-পুরুষের। ভালোবাসা সব প্রাণের। এমনকি বস্তুরও। তাই তো মহাকর্ষ, বস্তুতে-বস্তুতে টান; এটিও ভালোবাসা। যুগের অসুখ হওয়া ভালোবাসা নয়;  না হয় আমরা শূন্যে ভাসতাম।

ভালোবাসা চলে। আসলে সময়ই এক ভালোবাসা। তাই তো সময়ের গতি কষ্ট দেয়। এক গভীর দুঃখবোধের সৃষ্টি করে। মানুষ খুঁজে ফেরে কোথায় সে; জন্ম-কৈশোর-যৌবন-বার্ধক্য-মৃত্যু।

এ বিশ্ব চরাচরে অনেক মানুষের বাস। অনেকেই গেছেন অজানার দেশে। অনেকেই আসছেন অজানার এ বিশ্ব চরাচরকে জানতে। কী আছে জানতে? কালো খোঁজে সাদায় কী আছে? সাদা ভালোবাসে বা ঘৃণা করে কালোকে। রকমফের হবেই। কেউ শিশু, কেউ যুবা, আবার কেউ বৃদ্ধ। কেউ জার্মান, কেউ আমেরিকান, আবার কেউ বাঙালি। কেউ মুসলিম, কেউ বৌদ্ধ, কেউ খ্রিস্টান। সৃষ্টির ভারসাম্যে-কেউ আকাশে বাঁধে ঘর, কেউ সমুদ্রে। কারো ভালোবাসা উড়ন্ত, কারো ভালোবাসা জমাট। ভালোবাসা চলছেই। এভাবেই অনেক দূর বা খুব কাছ থেকে কেউ তার ভালোবাসার হিসাব কড়ায়-গন্ডায় বুঝে নিচ্ছেন।

ভালো থাকুক ভালোবাসা। ভালোই থাকে ভালোবাসা। ভালোর তরে ভালোবাসা।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক