• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮
abc constructions

মেয়ের নাম ‘স্পৃহা’ রেখে আইসিইউ থেকে মায়ের চিরবিদায়


নিজস্ব প্রতিবেদক আগস্ট ৫, ২০২১, ০৯:২৫ পিএম
মেয়ের নাম ‘স্পৃহা’ রেখে আইসিইউ থেকে মায়ের চিরবিদায়

সংগৃহীত ছবি

ঢাকা: প্রাণঘাতী করোনায় আক্রান্ত অবস্থায় মেয়েকে জন্ম দেন লাবণী রায়। মেয়ের জন্মের পরই তাকে যেতে হয় হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। সেখানে স্বামী সঞ্জয় করকে বলে যান, মেয়ের নাম রাখবেন ‘স্পৃহা’।এরপর আর মেয়েকে কোলেও নিতে পারেননি লাবণী। আইসিউই থেকেই চিরবিদায় নিতে হয়েছে তাকে। 

রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ২ আগস্ট মারা যান লাবণী রায়। গত ২৮ জুলাই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মেয়ে স্পৃহার জন্ম। মেয়ে জন্মের পর দুই থেকে তিন দিন তেমন কোনো জটিলতা ছিল না। তবে করোনা পজিটিভ হওয়ায় মেয়েকে কাছে নিতে পারেননি এই মা।

বড় মগবাজারে স্পৃহা এখন আছে সঞ্জয় করের বড় বোন সুমনা করের কাছে। মেয়ে কার কাছে থাকবে, সে সিদ্ধান্তও লাবণী আইসিইউতে যাওয়ার আগে জানিয়ে গিয়েছিলেন।

লবণীর বড় বোন সুমনা সাংবাদিকদের জানান, ‘এই মেয়ে আমাদের আদরের ধন। ওকে হয়তো ওর মায়ের আদর দিতে পারব না, তবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব লাবণীর শেষ চিহ্নকে ভালো রাখতে।’

সুমনা জানালেন, গত ২১ জুলাই থেকে লাবণীকে নিয়ে তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা। দীর্ঘ নয় বছর পর লাবণী মা হতে যাচ্ছেন অন্যদিকে করোনাকাল, তাই তার প্রতি যত্নটাও বেশি নিতে হয়েছে। সঞ্জয় ব্যাংকে চাকরি করেন, তাই বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই আলাদা ঘরে থাকতেন। তবে শেষ পর্যন্ত এসব সচেতনতাও রক্ষা করতে পারেনি লাবণীকে।

২১ জুলাই প্রথম লাবণীর জ্বর আসে। এ ছাড়া করোনার আর কোনো উপসর্গ ছিল না। লাবণীকে পারিবারিক চিকিৎসক নাপা খাওয়ার পরামর্শ দেন। তারপর জ্বর ছেড়ে যায়। আবার জ্বর আসে ২৫ জুলাই। লাবণী একবার শুধু বলেছিলেন, খাবারের স্বাদ ও গন্ধ পাচ্ছেন না। তবে এক দিন পরই জানিয়েছিলেন এসব সমস্যা আর নেই। ২৬ তারিখ করোনা পরীক্ষার জন্য স্যাম্পল দেওয়া হয়। ২৭ তারিখ জানা যায়, সঞ্জয় করের করোনা পজিটিভ, তবে লাবণীর করোনা নেগেটিভ। সঞ্জয় কর করোনার দুটো টিকা নিয়েছেন। তবে লাবণীর বয়স ছিল ৩০ বছর, আর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে টিকা দেওয়া হয়নি।

সুমনা বলেন, ২৭ জুলাই আবার জ্বর এলে অন্য আর একটি সংস্থার লোকজন লাবণীর স্যাম্পল বাসা থেকে নিয়ে যান। ডেঙ্গুর পরীক্ষায় ডেঙ্গু নেগেটিভ আসে। কাগজে-কলমে করোনা নেগেটিভ এলেও লাবণীর বিভিন্ন টেস্টের ফাইল নিয়ে মেডিসিন বিশেষজ্ঞসহ কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করতে থাকেন পরিবারের সদস্যরা। পেটের সন্তান যাতে কোনো ঝুঁকিতে না পড়ে, ১২ ঘণ্টার বিরতিতে চিকিৎসক লাবণীকে দুটো ইনজেকশন দেন। এই সব জটিলতার আগে লাবণীর প্রস্রাবে সংক্রমণ দেখা দিলে তখন তাকে অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হয়েছিল। 

২৭ জুলাইয়ের জ্বরের পর লাবণী কাহিল হয়ে পড়েছিলেন। আরেকটি সংস্থা যে রিপোর্ট দেয় তাতে সঞ্জয় ও লাবণীর করোনা পজিটিভ আসে।

সুমনা আক্ষেপ করে বলেন, ‘লাবণীর করোনা পজিটিভ এ রিপোর্টটা যদি প্রথমবারই আসত, তাহলে আরও আগেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে পারতাম। করোনা নেগেটিভ দেখে হাসপাতালে ভর্তি করতে সাহস পাইনি। ভেবেছিলাম, এ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করলে তাকে যদি করোনা ওয়ার্ডে দিয়ে দেয়। করোনা পজিটিভ দেখে মাথায় নতুন চিন্তা ভর করে, হাসপাতালে আইসিইউ বা বাচ্চা যদি আগেই ডেলিভারি করতে হয়, তাহলে বাচ্চার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা আছে, এমন হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। করোনার এ পরিস্থিতিতে আইসিইউ পাব তো?’

সুমনা জানালেন, সব দিক বিবেচনায় লাবণীকে ২৮ জুলাই রাজধানীর বেসরকারি ইমপালস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। করোনায় অন্তঃসত্ত্বা নারীর জন্য যে প্রটোকল, সে অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু হয়। সন্ধ্যায় আলট্রাসনোগ্রাম করে দেখা যায় পেটে বাচ্চার হার্টবিট কমে যাচ্ছে। সেদিন রাত পৌনে আটটার দিকে অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় স্পৃহার। অস্ত্রোপচারের পরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ ২০ ঘণ্টাও বেশ ভালোভাবেই পার করেন। পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন, মেয়েকে নিয়ে সুস্থভাবেই বাড়ি ফিরবেন লাবণী। তবে তারপর পাল্টে যায় সবকিছু।

সুমনা বলেন, ‘সিজারের পর মুখে খাবার খেতে শুরু করে লাবণী, বাসায় রান্না করা পাতলা ডাল দিয়ে ভাত খেতে চেয়েছিল। তার জন্য ডাল, মাছ, ভাজি পাঠালে মজা করেই খেয়েছিল। ৩০ জুলাই লাবণীর অক্সিজেন লেভেল কমতে শুরু করে। তারপর আইসিইউ, লাইফ সাপোর্ট সব দিয়েও বাঁচানো গেল না।’

করোনা মানুষকে বিশেষ করে ভুক্তভোগী পরিবারকে কতটা বিপর্যস্ত করে ফেলেছে সে প্রসঙ্গে সুমনা বলেন,‘ লাবণীকে শ্মশানে রেখে আসলাম। সঞ্জয়ের করোনা, তাই আমরা তাকে ধরে একটু সান্ত্বনাও দিতে পারিনি। মেয়ে আমার কাছে, তাই সঞ্জয়কে একা তার ফ্ল্যাটে পাঠাতে বাধ্য হলাম। ভাইবোনেরা একসঙ্গে ভিডিও কল দিয়ে ভাইকে বলি, কোনো কথা বলার দরকার নেই, তুই শুধু আমাদের কথা শুনবি। তারপর ঘুমিয়ে যাবি।

ভিডিও কলে ভাই অনেকক্ষণ হাউমাউ করে কান্নাকাটি করে। আমাদের কথা শুনতে শুনতে একসময় ভাই ঘুমিয়ে গেলে আমরা ফোন ছাড়ি। তারপর থেকে ভিডিও কলেই ও তার মেয়েকে দেখছে আর কান্নাকাটি করছে।’

সূত্র-প্রথম আলো

সোনালীনিউজ/আইএ

Haque Milk Chocolate Digestive Biscuit
Dutch Bangla Bank Agent Banking
Wordbridge School
Sonali IT Pharmacy Managment System