রাজশাহী: নগরীসহ বিভিন্ন উপজেলায় নিম্নবিত্তের ঘরে ঘরে এনজিও ঋণ রয়েছে। এসব কারণে মানসিক চাপে পড়ে আত্মহত্যার পথ বেঁচে নিচ্ছে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি।
তাদের ঘরে বাড়ছে মানসিক অশান্তি। অভাব-অনটন, পানচাষ, আলুচাষসহ বিভিন্ন কারণে নিম্মবিত্তরা এনজিও ঋণের দারস্থ হন। তাদেরকে বিভিন্ন এনজিও ঋণ দেন। কিন্তু পরিশোধ করতে গিয়ে অতিরিক্ত সুদের কারণে পড়ে যান বিপত্তিতে। ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে মানসিক চাপে ভোগেন। শেষ পর্যন্ত তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
সম্প্রতি রাজশাহী জেলায় কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনার কারণ হিসেবে ঋণগ্রস্ত হওয়ায় বেশি নজরে আসে। গত ঋণের কারণে স্ত্রী, ছেলে ও শিশুকন্যাকে হত্যার পর রাজশাহীর পবা উপজেলার বামনশিকড় গ্রামের মিনারুল ইসলামের আত্মহত্যার ঘটনা সবাইকেই তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
ওই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই কোনো না কোনো সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছেন। তারাও ঋণ নিয়ে চাপের কথা বলছেন।
এ অবস্থায় ঋণ দেওয়া সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক ডেকেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান। তিনি এ বিষয়ে সবার সঙ্গে কথা বলতে চান। এ ঘটনার কিছুদিন আগে ও পরে রাজশাহীতে ঋণের চাপে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।
তবে এ ধরণের মৃত্যু নিয়ে অবশ্য সরকারি কোনো পরিসংখ্যান নেই। গত ১৫ আগস্ট সকালে পবা উপজেলার বামনশিকড় গ্রামে মিনারুল ইসলাম (৩০), তার স্ত্রী মনিরা বেগম (২৮), ছেলে মাহিম (১৩), মেয়ে মিথিলার (৩) লাশ পাওয়া যায়। ঘরে মেলে মিনারুলের লিখে যাওয়া দুই পাতার একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়।
এতে তিনি লিখে যান, ঋণের চাপে ও খাবারের অভাবে তিনি একে একে মনিরা, মাহিম ও ছোট্ট মিথিলাকে হত্যার পর নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এই ঘটনার রেস না কাটতেই সোমবার (১৮ আগস্ট) সকালে জেলার মোহনপুর উপজেলার খাড়ইল গ্রামের পানবরজে আকবর শাহ (৫০) নামের পানচাষির লাশ পাওয়া যায়।
তিনিও ঋণগ্রস্ত ছিলেন। তার বাড়ি থেকে ১৩ টি বেসরকারি ঋণদাতা সংস্থার পাশ বই উদ্ধার করা হয়। এর আগে গত ১৬ জুলাই পবার নওহাটা কলেজ মোড় এলাকার একটি ছাত্রাবাসে মো. শামসুদ্দিন (৩২) নামের এক সিএনজি অটোরিকশা চালক আত্মহত্যা করেছেন। তার বাড়ি তানোর উপজেলায়। ঋণের বোঝা টানতে না পেরে তিনি এলাকা ছেড়ে নওহাটায় থাকছিলেন।
শামসুদ্দিনের স্ত্রী শিলা খাতুনের ভাষ্য, স্বামীর ঋণ পরিশোধে তিনি নিজেও টেক্সটাইল মিলে শ্রমিকের কাজ করছিলেন। এরমধ্যেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তার স্বামী।
মোহনপুরের বেলনা গ্রামের রিকশাচালক ফজলুর রহমানও (৫৫) জর্জরিত ছিলেন ঋণে। গত (১৪ আগস্ট) রাতে এলাকায় তাকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা ফজলুরের মুখ থেকে অনবরত লালা পড়ছে, মুখ দিয়ে বিষের গন্ধ বের হচ্ছে। তাকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে পরদিন তার মুত্যু হয়।
স্বজনদের দাবি, ২০২২ সালে কেশরহাট এলাকার সুদের কারবারি ধুলু মিয়ার (৪৫) কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন ফজলুর। সুদসহ ৪৩ হাজার টাকা শোধ করলেও আরও টাকা দাবি করছিলেন ধুলু। তাদের অভিযোগ, টাকা না দেওয়ায় ধুলু মিয়াসহ কয়েকজন ফজলুরকে ঘাস মারার বিষ খাইয়ে ফেলে রেখে চলে যান। মৃত্যুর আগে ছেলেকে ফজলুর নামও বলে যান। এ ঘটনায় স্ত্রী আনজুয়ারা বিবি হত্যা মামলা করলে পুলিশ ধুলুকে গ্রেপ্তার করেছে।
এর আগে ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ জেলার দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামপুর গ্রাম থেকে রেন্টু পাইক (৫০) নামের এক কৃষকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। সেদিন তার ৫ হাজার টাকা কিস্তি দেওয়ার কথা ছিল। তিনি আত্মহত্যা করেন কিস্তির টাকা জোগাড় করতে না পেরে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজশাহী জেলার অধিকাংশ নিম্নআয়ের মানুষের ঘরে ঘরেই এনজিওর ঋণ রয়েছে। অভাবে পড়ে কেউ বাধ্য হয়েছেন ঋণ নিতে, কাউকে আবার জোর করেই রাখা হয়েছে এনজিওতে। কেউ কেউ আবার এক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আরেক এনজিওর ঋণ শোধ করেন। কৃষকরা পানচাষ কিংবা আলুচাষের মাধ্যমে অধিক মুনাফা লাভের আশায় এনজিও থেকে ঋণ নেন।
কিন্তু এসব ফসলের দাম কম হলেই পড়ে যান বিপদে। এনজিও ঋণ শোধ হয় না। মানসিক চাপে পরিবারে অশান্তির কারণে আত্মহত্যার পথে ঝুঁকে পড়েন।
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার গোবিন্দপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার নিজের গ্রাম গোবিন্দপাড়া। এই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ ঋণগ্রস্ত। মানুষ তো গরিব, ঋণ না নিয়ে উপায় থাকে না। কিন্তু একবার ঋণ নিলে তা শোধ হয় না। ঋণের চাপে স্ত্রী-সন্তানদের হত্যার পর আত্মহত্যা করা মিনারুলের গ্রামেরও বেশিরভাগ মানুষ ঋণগ্রস্ত। এ গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘গোটা গ্রামে প্রায় ২৫০ বাড়ি আছে। দু’চার বাড়ি হয়তো পাওয়া যাবে তাদের ঋণ নাই। বাকি সবারই কোথাও না কোথাও ঋণ আছে।’
মিনারুলের ঋণ ছিল বেসরকারি সংস্থা টিএমএসএসে। সংস্থার খড়খড়ি শাখার ব্যবস্থাপক মশিউর রহমান বলেন, ‘বামনশিকড়ে আমাদের সদস্য আছে প্রায় ৮০ জন। মিনারুলের আর অল্প কিছু টাকা বাকি ছিল। সে জন্য তাকে চাপাচাপি করা হয়নি। কাউকেই আমরা চাপ দিই না।’
মোহনপুরে আত্মহত্যা করা পানচাষী আকবর শাহ’র বাড়িতে তার স্ত্রীর নামে পাওয়া গেছে ১১টি সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের পাশ বই।
তার মৃত্যু প্রসঙ্গে মোহনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান বলেন, আকবরের বাড়িতে ১১টা পাশবই পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ৬-৭টি পাশবইয়ে ঋণ ছিল। সপ্তাহে ৫ হাজার টাকা কিস্তি লাগত। কিস্তি দিতে না পারার কারণে মানসিক চাপে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে আমাদের ধারণা।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার দুবইল গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলামের ঋণ আছে। তিনি বলেন, ‘ঋণ আমি নিয়মিতই পরিশোধ করি। কিন্তু একদিন যদি দেরি হয়, এনজিওর লোকেরা এসে বসে থাকে। টাকা না নিয়ে উঠে না। বাড়িতে না থাকলে বার বার পাক পাড়তেই থাকে। মানুষিক চাপে রয়েছেন বলে জানান তিনি।
স্ত্রী-সন্তানদের হত্যার পর আত্মহত্যা করা মিনারুল ইসলামের চাচি জানেহার বেগম বলেন, ‘মিনারুল কিস্তির চাপে ঠিকমতো বাড়িতেই থাকতে পারত না।
কিস্তির লোকেরা বাড়ি আসত, আমরা বুঝিয়ে পাঠাতাম যে- “বাবা, এখন তো মিনারুল বাড়িত নাই, পরে আইসো।” কিন্তু তারা ঘুরে ফিরে আসত। রাত ৮টা বেজে গেলেও বাড়ির পাশেই বসে থাকত।
ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে রুরাল রিকনস্ট্রাকশন ফাউন্ডেশন (আরআরএফ) নামের একটি এনজিওর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর শাখা থেকে ঋণ নিয়েছিলেন জহুরুল ইসলাম (৫৫)। বিদেশে গিয়ে ছেলে দুর্ঘটনায় পড়লে তিনি দুটি কিস্তি পরিশোধ করতে পারেননি। এনজিওর মাঠকর্মীরা বার বার বাড়িতে গিয়ে টাকার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। উপায় না পেয়ে রাজশাহী শহরের বিনোদপুরে সদ্য বিয়ে দেওয়া মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে আত্মগোপন করেন জহরুল।
কিন্তু গত ২৯ এপ্রিল সেখানে গিয়েও জহুরুলকে খুঁজে বের করেন আরআরএফের কর্মীরা। অপমান করেন মেয়ের শ্বশুরবাড়িতেই। তখন বানেশ্বরে এনজিওর কার্যালয়ে গিয়ে জহুরুল বলেছিলেন, এভাবে চাপ দিলে আত্মহত্যা ছাড়া তার পথ থাকবে না।
তাতেও মন গলেনি কর্মকর্তাদের। ফলে সেদিন দুপুরে ঘাস মারা বিষ কিনে নিয়ে গিয়ে এনজিও কার্যালয়েই পান করেন জহুরুল।
এরপর সপ্তাহখানেক হাসপাতালে থাকলেও এখনও তিনি সুস্থ হতে পারেননি। বলেছে মরে গেলেও কিস্তি দিতে হবে। মেয়ের বাড়ি গিয়ে অপমান করেছে। আমি সহ্য করতে পারিনি। মরে যাওয়ার জন্য বাজার থেকে বিষ কিনে এনে অফিসেই খেয়ে ফেলি।’
রাজশাহীতে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে অগণিত অনিয়ম। দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে সদস্য বাড়াতে এনজিওগুলোর ঋণের ফাঁদে ফেলার মতো কার্যক্রম, ঋণ আদায়ে বাড়তি চাপ ও অতিরিক্ত সুদ আদায়ের ব্যাপারে আরও কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এআর
আপনার মতামত লিখুন :