ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে মালিকানাভিত্তিক শিল্পায়ন গড়ে তুলতে চায় সরকার। এজন্য উদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণের পরিবর্তে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘শেয়ারবাজারের নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। পুঁজিবাজারবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) সেমিনারটির আয়োজন করে।
তিতুমীর বলেন, দেশের অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে বিনিয়োগভিত্তিক মডেলে যেতে হবে। শুধু ঋণনির্ভর অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। তাই কে ব্যাংকঋণ পাবে আর কে পুঁজিবাজারে যাবে—এ বিষয়ে নীতিগত দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা হবে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ বিষয়ে রূপান্তরমূলক সংস্কারের পদক্ষেপ থাকবে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে সাধারণ মানুষের মালিকানা ও অংশগ্রহণের জায়গায় নিয়ে যেতে চায় সরকার। এর অংশ হিসেবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ ‘ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে তারা সহজে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারেন। পাশাপাশি মুসলিম দেশগুলোর বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ইসলামিক ফাইন্যান্স মার্কেট সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তথ্যপ্রযুক্তি এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানান তিতুমীর। তিনি বলেন, অডিট প্রতিষ্ঠান, সম্পদ মূল্যায়নকারী সংস্থা ও ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। যারা ভালো কাজ করবে তাদের পুরস্কার এবং অনিয়মকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।
তিনি জানান, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের পুঁজিবাজারকে ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ থেকে ‘ইমার্জিং মার্কেট’-এ উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান।
বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, গত দেড় বছরে কমিশন ১২৬টি তদন্ত সম্পন্ন করেছে এবং বিভিন্ন অনিয়মের জন্য প্রায় ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা জরিমানা করেছে। এছাড়া এনফোর্সমেন্ট বিভাগে তিন শতাধিক মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো ১৬টি মানি লন্ডারিং সংশ্লিষ্ট মামলা দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, দেশে অনেক আইন থাকলেও সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন হয় না। পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হলে সিস্টেমগত দুর্বলতা দূর করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন কোনো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা যাবে না, যারা বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিতে সক্ষম নয়।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সিএমজেএফ সভাপতি মনির হোসেন। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সিনিয়র সহসভাপতি মনিরুজ্জামান এবং অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিএমজেএফ সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব।
বক্তারা বলেন, দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় কাঠামোগত ভারসাম্য আনতে শক্তিশালী ও গভীর পুঁজিবাজার গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমানে ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে চাপ তৈরি হচ্ছে। পুঁজিবাজার সক্রিয় হলে সেই চাপ অনেকটাই কমবে এবং অর্থনীতিতে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন সহজ হবে।
এএইচ/এম
আপনার মতামত লিখুন :