ছবি : প্রতিনিধি
ঢাকা: বিশ্বের উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছাবে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ। তবে বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তাঁদের মধ্যে কর্মসংস্থান হবে মাত্র ৪০ কোটি মানুষের। ফলে প্রায় ৮০ কোটি কর্মসংস্থানের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং উন্নয়ন অর্থায়নের প্রচলিত কাঠামোয় পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেছেন, কর্মসংস্থান কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে মানুষের মর্যাদা, আয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জড়িত। তাই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন বৈশ্বিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভার প্লেনারি অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
অজয় বাঙ্গার মতে, কর্মসংস্থান বাড়াতে অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং বেসরকারি পুঁজির সম্প্রসারণ জরুরি। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থের জোগান বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করতে হবে। শুধু সরকারি ঋণ বা উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
উন্নয়ন অর্থায়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি মূলধন সংহত করেছিল। গত অর্থবছরে এ পরিমাণ বেড়ে ১১২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নসহ মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ২৩০ বিলিয়ন ডলার।
এই অর্থায়নের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, কৃষি ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন ও উৎপাদনশিল্পের মতো কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে যাচ্ছে। এ ছাড়া গত এক বছরে রেকর্ড ৯৬ বিলিয়ন ডলারের জলবায়ু অর্থায়ন করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৮ বিলিয়ন ডলার এসেছে বেসরকারি খাত থেকে।
বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পনা হলো, সরকারি অর্থায়ন ও উন্নয়ন সহযোগিতার মাধ্যমে এমন অবকাঠামো এবং প্রকল্প গড়ে তোলা, যা বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে। যেসব খাতে এখনো বেসরকারি বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়নি, সেখানে সরকারি অর্থায়ন সহায়ক ভূমিকা রাখবে। আর যেসব খাতে বেসরকারি পুঁজি উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে, সেখানে বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হবে।
উন্নয়ন প্রকল্পে গতি আনতে সংস্কার
বিশ্বব্যাংকের কার্যক্রম দ্রুত ও কার্যকর করতে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের কথাও তুলে ধরেন অজয় বাঙ্গা। তিনি জানান, প্রকল্প প্রস্তুতির গড় সময় ১৯ মাস থেকে কমিয়ে নয় মাসে আনা হয়েছে। জটিল মূল্যায়নব্যবস্থার পরিবর্তে ২২টি সুনির্দিষ্ট সূচকের মাধ্যমে প্রকল্পের ফলাফল পরিমাপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ব্যালান্স শিটের সক্ষমতা বাড়ানোর ফলে আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংক (আইবিআরডি) আগামী এক দশকে অতিরিক্ত ১০০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। অন্যান্য বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে যৌথ অর্থায়নের পাইপলাইনও বেড়ে ২৫০টি প্রকল্পে পৌঁছেছে। এসব প্রকল্পে মোট ১৩৮ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের লক্ষ্য রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে অর্থায়নের পরিধি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো, সীমিত সরকারি সম্পদ দিয়ে আরও বেশি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিতে গুরুত্ব
কর্মসংস্থান সৃষ্টির কৌশলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের অর্থায়ন সহজ করা, উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্ষেত্রেও বড় ও ব্যয়বহুল প্রযুক্তির পাশাপাশি সহজলভ্য এবং ব্যবহারিক প্রযুক্তির ওপর জোর দিয়েছেন অজয় বাঙ্গা। তাঁর মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষক, শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ছোট ও সহজে ব্যবহারযোগ্য এআই টুল উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে।
তবে এসব প্রযুক্তির সুবিধা পেতে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগ এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি। প্রযুক্তির সুফল যেন শুধু উন্নত দেশ ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নয়ন অর্থায়নে নতুন উৎসের সন্ধান
দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়াতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ আরও পাঁচটি শীর্ষ বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে নতুন অর্থায়নব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ করছে। এর মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে পেনশন তহবিল ও সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের মতো বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
উদীয়মান বাজারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে স্বতন্ত্র বিনিয়োগ সম্পদশ্রেণি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি বেসরকারি মূলধন আকর্ষণের সুযোগ বাড়বে। এতে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং বিনিয়োগের পরিধি সম্প্রসারিত হবে।
বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিদ্যুৎ, নিরাপদ পানি, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আফ্রিকায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ কোটি মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্যে ‘মিশন ৩০০’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের সহায়তা এবং সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের জন্যও বড় কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
অজয় বাঙ্গার মতে, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মবাজারে প্রবেশের বিষয়টি যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার সুযোগও। এ সুযোগ কাজে লাগাতে সরকারি অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের দৃষ্টিতে, টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। নতুন শিল্প ও ব্যবসার সম্প্রসারণের মাধ্যমে তৈরি হবে কর্মসংস্থান, বাড়বে মানুষের আয় এবং উন্নয়নের সুফল পৌঁছাবে আরও বেশি মানুষের কাছে।
এএইচ/পিএস