বেপরোয়া মার্কিন প্রেসিডেন্টদের শেষ পরিণতি কী ছিল?

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জানুয়ারি ১১, ২০২৬, ১১:৪৪ এএম
বেপরোয়া মার্কিন প্রেসিডেন্টদের শেষ পরিণতি কী ছিল?

যখন কোনো নির্বাচিত সরকারপ্রধান নিজেকে আইন, প্রতিষ্ঠান ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেন, তখন সেটি আর কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চা থাকে না—তা রূপ নেয় শাসনব্যবস্থার জন্য সরাসরি হুমকিতে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য—“নিজেকে ছাড়া আমাকে থামানোর মতো কেউ নেই”—এই উদ্বেগকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কি ট্রাম্পই প্রথম এমন প্রেসিডেন্ট, যিনি নিজেকে ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস হিসেবে উপস্থাপন করেছেন? নাকি তার আগেও এমন উদাহরণ রয়েছে—আর সেসব ক্ষেত্রে ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কী রায় দিয়েছে?

ক্ষমতার সীমা অস্বীকারের ঘোষণা

২০২৬ সালের শুরুতে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর পর নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, তাকে থামানোর মতো কোনো শক্তি নেই—নিজেকে ছাড়া। এই মন্তব্য আসে এমন সময়ে, যখন তিনি কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক আইন কতটা কার্যকর হবে, সেটিও নিজের ব্যাখ্যার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।

এটি বিচ্ছিন্ন কোনো বক্তব্য নয়। ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ–২ তাকে যা খুশি করার ক্ষমতা দেয়। ২০২০ সালে তিনি ইরানের সাংস্কৃতিক স্থাপনায় হামলার হুমকি দেন—যা আন্তর্জাতিক আইনে সরাসরি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত। চলতি বছর কংগ্রেসের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগকে তিনি ‘ভুয়া’ ও ‘অসাংবিধানিক’ আখ্যা দিয়ে নাকচ করেন।

এই ধারাবাহিকতায় ট্রাম্প নিজেকে কেবল নির্বাহী প্রধান নয়, বরং আইনের সংজ্ঞা নির্ধারণকারী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছেন।

নিক্সনের পতন: বেপরোয়া ক্ষমতার তাৎক্ষণিক শাস্তি

ট্রাম্পের সঙ্গে সবচেয়ে সরাসরি তুলনীয় নামটি রিচার্ড নিক্সন। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর ১৯৭৭ সালে সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিক্সন famously বলেছিলেন—“প্রেসিডেন্ট যা করেন, তা বেআইনি হতে পারে না।”

এই দৃষ্টিভঙ্গির ফল ছিল ভয়াবহ। গোপন নজরদারি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে নিক্সন অভিশংসনের মুখে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তিনিই প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি এমন লজ্জাজনক পরিণতির শিকার হন। নিক্সনের ঘটনা দেখিয়ে দেয়—ক্ষমতাকে আইন থেকে বিচ্ছিন্ন করলে তা দ্রুতই নিজের বিরুদ্ধে ফিরে আসে।

বুশ প্রশাসন: তাৎক্ষণিক নয়, দীর্ঘমেয়াদি মূল্য

৯/১১–পরবর্তী সময়ে জর্জ ডব্লিউ. বুশ সরাসরি এমন উদ্ধত ভাষা ব্যবহার না করলেও তার প্রশাসন কার্যত সীমাহীন ক্ষমতার চর্চা করে। ‘ওয়ার অন টেরর’-এর অজুহাতে চালু হয় টর্চার মেমো, গুয়ানতানামো বে, আদালতের অনুমতি ছাড়া গণনজরদারি।

আফগানিস্তান ও ইরাকে দীর্ঘ সামরিক অভিযানে প্রায় দুই দশকে হাজার হাজার মার্কিন সেনা প্রাণ হারান, আর স্থানীয় বাহিনী ও বেসামরিক নাগরিক মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা পৌঁছে যায় লাখে। শুধু এই দুই যুদ্ধেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ছাড়িয়ে যায় ট্রিলিয়ন ডলার।

বুশ ব্যক্তিগতভাবে তাৎক্ষণিক আইনি শাস্তির মুখে না পড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান বিশ্বজুড়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় দীর্ঘদিন বহন করতে হয় পরবর্তী প্রশাসনগুলোকে। ইতিহাস এখানেও এক কঠিন সত্য তুলে ধরে—পরিণতি দেরিতে এলেও তা অনিবার্য।

লিংকন ও রুজভেল্ট: ক্ষমতা বনাম দায়িত্ব

গৃহযুদ্ধের সময় আব্রাহাম লিংকন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সাময়িকভাবে সাংবিধানিক অধিকার স্থগিত করেছিলেন। বাইরে থেকে এটি ক্ষমতার অপব্যবহার মনে হলেও লিংকন নিজেকে কখনো ক্ষমতার মালিক হিসেবে নয়, রাষ্ট্র রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে তুলে ধরেন। পরবর্তীতে তার সিদ্ধান্তগুলো সাংবিধানিক বিতর্কের মধ্য দিয়ে বৈধতা পায়।

থিওডোর রুজভেল্টের ‘স্টুয়ার্ডশিপ থিওরি’ও শক্তিশালী প্রেসিডেন্সির কথা বলে, তবে সেখানে প্রেসিডেন্ট নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখেন না। জনগণের স্বার্থই ছিল তার যুক্তির কেন্দ্রবিন্দু।

ট্রাম্প কেন আলাদা এবং বেশি ঝুঁকিপূর্ণ

নিক্সন, বুশ বা রুজভেল্ট—সবাই কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্রীয় সংকট, জাতীয় স্বার্থ বা জরুরি পরিস্থিতির যুক্তি দেখিয়েছেন। ট্রাম্প সেখানে ভিন্ন। তিনি বলেন না যে পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করছে; বরং বলেন—“আমিই একমাত্র সীমা।”

এই আত্মকেন্দ্রিক ক্ষমতাবোধই তাকে সবচেয়ে বেপরোয়া করে তোলে।

ইতিহাসের রায় অনিবার্য

মার্কিন ইতিহাসের একটি স্পষ্ট ধারাবাহিকতা রয়েছে—ক্ষমতা যত সীমাহীন হয়েছে, পরিণতি তত কঠোর হয়েছে। কখনো তা তাৎক্ষণিক (নিক্সন), কখনো দীর্ঘমেয়াদি (বুশ), আবার কখনো ইতিহাসের বিচারে ধীরে ধীরে (যা ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও অনিবার্য বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা)।

গণতন্ত্রে রাজা না থাকলেও রাজসিক মানসিকতা ভয়ংকর। আর ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—“আমাকে থামানোর কেউ নেই”—এই দাম্ভিকতাই শেষ পর্যন্ত নিজেই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বাধা।

Link copied!