সময়ের ধারাবাহিকতায় আরও একটি বছর ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিল। বিদায় নিল ২০২৫, আর নতুন সূর্যের আলো নিয়ে আবির্ভূত হলো ২০২৬। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টালেও মানুষের স্মৃতিতে রয়ে গেল একটি উত্তাল সময়—যেখানে ছিল শোক, প্রতিবাদ, সংগ্রাম আর নতুন দিনের স্বপ্ন। নতুন বছর তাই শুধু সময়ের পরিবর্তন নয়; এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নতুন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে এসে দেশের সার্বিক আবহ ছিল ভারী ও শোকাবহ। গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে দেশজুড়ে নেমে আসে গভীর শোক। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় মানুষ স্মরণ করেছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ও আপসহীন নেতৃত্বকে। একই সময়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড জাতিকে নাড়া দেয়। এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দেয়—সমাজ আর অন্যায় ও অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির কাছে নত হতে প্রস্তুত নয়।
২০২৫ সাল ছিল বিচার ও রাজনীতির দিক থেকেও ঘটনাবহুল। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করে। একপক্ষ এটিকে ন্যায়বিচারের প্রতিফলন হিসেবে দেখলেও অন্যপক্ষের মধ্যে তৈরি হয় বিতর্ক। তবু সময় থেমে থাকে না—সময়ের নিয়মেই পুরোনো বছর বিদায় নিয়ে নতুন বছর সামনে এগিয়ে আসে।
নতুন বছর মানেই নতুন আশা ও নতুন সংকল্প। ২০২৬-এর আগমন এমন এক সময়ে, যখন দেশের মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব আরও দৃঢ়ভাবে নিজেদের হাতে নিতে চায়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম—যারা সাম্প্রতিক আন্দোলন ও গণজাগরণে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে—তারাই হয়ে উঠছে আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণের প্রধান শক্তি।
২০২৬ সালের প্রথম ভোর তাই কেবল একটি দিনের সূচনা নয়; এটি একটি মানসিক রূপান্তরের ইঙ্গিত। এই ভোর জানান দেয়, জাতি আর শুধু টিকে থাকার কথা ভাবছে না—বরং আত্মবিশ্বাস ও সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়েছে। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, সংকটকে শক্তিতে রূপান্তর করে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্নই এখন প্রধান চালিকাশক্তি।
এই নতুন বছরে দেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অপেক্ষা করছে। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে তৎপরতা। অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক যাত্রা শুরুর প্রত্যাশা করছেন সাধারণ মানুষ।
বিশ্ব পরিসরেও ২০২৬-এর সূচনা ছিল উৎসবমুখর। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা—সময় অঞ্চলের ভিন্নতায় ধাপে ধাপে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়েছে বিশ্ব। কোথাও আতশবাজি, কোথাও ধর্মীয় আয়োজন, কোথাও পারিবারিক মিলনমেলায় উদযাপিত হয়েছে বছরের প্রথম প্রহর। তবে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ ও জলবায়ু সংকটের বাস্তবতায় অনেক দেশ নতুন বছরকে ঘিরে শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রত্যাশাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য কেবল আরেকটি বছর নয়। এটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা—যেখানে অতীতের ত্যাগ ও বেদনাই হয়ে উঠবে আগামীর ভিত্তি। অপূর্ণতা থাকলেও এই দেশ এখন স্বপ্ন দেখতে জানে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে জানে এবং কঠোর পরিশ্রমে নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিশ্বাস রাখে। নতুন বছরের এই প্রত্যয়ই হোক এগিয়ে যাওয়ার মূল শক্তি।
এম
আপনার মতামত লিখুন :