ছবি: সংগৃহীত
এ যেন দীর্ঘ বন্দিদশা পেরিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার গল্প। টানা দেড় বছর বঙ্গভবনে নানা চাপ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটানো সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শুক্রবার রাতে বঙ্গভবনে তাঁর কার্যালয়ে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি ওই সময়কে ঝড়ঝাপটায় ভরা এক অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়টিতে তিনি নিজে কোনো আলোচনায় না থাকলেও তাঁকে ঘিরে নানা ষড়যন্ত্র চলেছে। সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি এবং তাঁকে অপসারণের চেষ্টা হয়েছে একাধিকবার। তবে তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকায় সেসব উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। ওই সময় তাঁর ওপর দিয়ে বড় ধরনের চাপ গেছে বলেও জানান তিনি।
বঙ্গভবন ঘেরাও ও পদত্যাগ দাবির আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে রাষ্ট্রপতি বলেন, পরিস্থিতি কখনো কখনো ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের রাতে নিরাপত্তা বাহিনীকে তিন স্তরে মোতায়েন করা হয়। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন দিক থেকে লোকজন এনে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা হয়েছিল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ভূমিকা রাখে। গভীর রাত পর্যন্ত উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হয়েছিল তাঁদের।
সে সময় রাজনৈতিকভাবে কারা পাশে ছিলেন-এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কঠিন সময়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁকে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে উৎসাহ দিয়েছিল। বিশেষ করে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আন্তরিকতা দেখিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি ও তাদের জোট অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি অপসারণের পক্ষে অবস্থান নেয়নি, ফলে একটি বড় রাজনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যায়।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, রাজনৈতিক পর্যায়ে অপসারণের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে দিয়ে তাঁকে প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনাও হয়েছিল, তবে ওই বিচারপতি অসাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান।
দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তাঁর সমন্বয় ছিল না বলেও জানান রাষ্ট্রপতি। বিদেশ সফর শেষে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করার সাংবিধানিক বিধান মানা হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি বলেন, একাধিক বিদেশ সফর হলেও তাঁকে জানানো হয়নি, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তির বিষয়েও তিনি অবগত ছিলেন না।
নিজের বিদেশ সফর নিয়েও বাধার কথা উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। কসোভো ও কাতারের আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে যেতে দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক খসড়া চিঠিতে তাঁকে ব্যস্ততার অজুহাতে সফর বাতিলের কথা জানাতে বলা হয়েছিল, যা নিয়ে তিনি আপত্তি জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁকে আড়ালে রাখতে পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলো থেকে তাঁর ছবি সরিয়ে ফেলার ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন। এতে জনগণের কাছে তাঁর অবস্থান দুর্বল দেখানোর চেষ্টা হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বঙ্গভবনের প্রেস উইং প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘটনাকেও তিনি অপমানজনক বলে বর্ণনা করেন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নেতারা সৌজন্য সাক্ষাৎ করলে সেটি প্রকাশ হওয়ায় পরদিন প্রেস উইংয়ের কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর থেকে বঙ্গভবন থেকে নিয়মিত প্রেস রিলিজ দেওয়াও বন্ধ হয়ে যায় বলে জানান তিনি। জাতীয় দিবসের ক্রোড়পত্রে রাষ্ট্রপতির বাণী প্রকাশ না হওয়ার ঘটনাও তিনি তুলে ধরেন।
সব মিলিয়ে দেড় বছরের সময়টিকে কঠিন হলেও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য নিজের অবস্থানে অটল থাকার সময় হিসেবে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।
এসএইচ
আপনার মতামত লিখুন :