ফাইল ছবি
সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য দূর করতে ঐতিহাসিক এক পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেই ঘোষণা হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল, যা আগামী ১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে কার্যকর হবে। নতুন এই বেতন কাঠামোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও ইতিবাচক দিক হলো সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনা। বিগত অষ্টম পে-স্কেলে এই ব্যবধানের অনুপাত যেখানে ছিল ১:৯ দশমিক ৪, এবার তা কমিয়ে ১:৮ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে নিচের দিকের গ্রেডে কর্মরত কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেতে যাচ্ছেন, যা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বৈষম্য দূর করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, নতুন কাঠামোতে মোট ২০টি গ্রেড বহাল থাকলেও বেতনের পরিমাণে আসছে আমূল পরিবর্তন। প্রস্তাবিত রূপরেখায় সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে এক লাফে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ বা প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হচ্ছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। হিসাব কষে দেখা গেছে, এই পরিবর্তনের ফলে পদমর্যাদা ও গ্রেডভেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন প্রায় ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। শতাংশের এই হিসাবে স্পষ্ট যে, উচ্চস্তরের কর্মকর্তাদের চেয়ে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার অনেক বেশি, যার ফলে তারাই এবার সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন।
সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশন গত জানুয়ারিতে এই বৈষম্যহীন রূপরেখা সংবলিত প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের সবুজ সংকেত দেওয়া হয়। এই নতুন পে-কমিশনের সুপারিশের আওতায় দেশের প্রায় ১৪ লাখ কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী সরাসরি আর্থিক সুরক্ষার আওতায় আসছেন। বিশেষ করে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে নিম্নআয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এই বর্ধিত বেতন অত্যন্ত কার্যকর সুফল দেবে।
তবে এককালীন বিশাল অর্থের জোগান দেওয়া সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন পে-স্কেল ও পেনশন সুবিধা পুরোপুরি কার্যকর করতে মোট ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এই বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে সরকার তিন বছরে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের বাস্তবসম্মত কৌশল নিয়েছে। আগামী ৭ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে বাজেট উপস্থাপন করবেন, সেখানে প্রথম ধাপের জন্য প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী জুলাই থেকে প্রথম ধাপে বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পরবর্তী অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ মূল বেতন এবং এর পরের বছর শতভাগ ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা চালু করা হবে। সম্পূর্ণ সুবিধা একবারে না এলেও বেতন বৈষম্য কমে আসায় এবং নিম্ন গ্রেডগুলোতে সর্বোচ্চ ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত মূল বেতন বৃদ্ধি পাওয়ায় মাঠপর্যায়ের সাধারণ কর্মচারীদের দীর্ঘ ১১ বছরের দুঃখ-দুর্দশা ও ক্ষোভের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। গেজেট বা প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে আগামী জুলাই থেকেই এই সাম্যমুখী ও যুগান্তকারী বেতন কাঠামো কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
এসএইচ
আপনার মতামত লিখুন :