দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন হয়েছে। এতে বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে স্বস্তি ও আনন্দ দেখা দিলেও এর বিপরীতে সরকারের অর্থসংস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।
নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য রাখা হয়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। একই সময়ে বাজেট ঘাটতি রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেলের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় বর্তমান বাজেট ঘাটতির প্রায় ৪৩ শতাংশের সমান।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, বাড়তি এই বিশাল অর্থের জোগান আসবে কোথা থেকে। কারণ দেশের অর্থনীতি এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ-গ্যাস খাতে চাপ এবং ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি বোঝার মধ্যে রয়েছে।
একসঙ্গে নয়, ধাপে বাস্তবায়ন
সরকার অবশ্য একবারে পুরো বেতন কাঠামো কার্যকর করছে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মূল বেতন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে কার্যকর হবে। বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
এর ফলে সরকারের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হবে না। তবে অর্থনীতিবিদদের দুশ্চিন্তার জায়গা অন্যত্র। বেতন ও ভাতা বাড়ানোর পর এই ব্যয় আর এককালীন থাকবে না; বরং প্রতিবছরই সরকারের স্থায়ী ব্যয়ের অংশ হয়ে যাবে। এর সঙ্গে ভবিষ্যৎ ইনক্রিমেন্ট, পেনশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যয়ও বাড়বে।
ফলে পে-স্কেলের অর্থ জোগানের ক্ষেত্রে রাজস্ব আয় বাড়ানোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে সরকারকে হয় উন্নয়ন ও অন্যান্য ব্যয় কমাতে হবে, নয়তো ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হবে।
ঋণনির্ভরতার ঝুঁকি
নতুন পে-স্কেলের অর্থায়ন নিয়ে সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের ঋণ নেওয়ার বক্তব্যও আলোচনায় এসেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, নিয়মিত সরকারি ব্যয় মেটাতে দীর্ঘমেয়াদে ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লে ভবিষ্যৎ বাজেটে সুদ ও ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে।
এর আগে ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সময়ও সরকারের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয়েছিল। তবে পে-স্কেলের জন্য আলাদা করে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার কোনো স্পষ্ট নজির নেই। সাধারণ বাজেটের আয়-ব্যয়ের কাঠামোর মধ্যেই অতিরিক্ত ব্যয় সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছিল।
এবারও সরকারের অবস্থান অনেকটা একই। মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে।
বেতন বাড়লেই কি দুর্নীতি কমবে?
নতুন পে-স্কেলের পক্ষে অন্যতম যুক্তি হলো সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক চাপ কমানো। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বলেছেন, সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক সংকট কমলে দুর্নীতির প্রবণতা কমতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় হলেও এটি দুর্নীতি বন্ধের একমাত্র সমাধান নয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন না থাকলে সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাগত দক্ষতা ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা আশা করা কঠিন। তবে শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে—এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদবিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, শুধু কর্মচারীর নিজের নয়, নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের আয় ও সম্পদের হিসাবও প্রতিবছর হালনাগাদ করা উচিত।
সর্বনিম্ন বেতন বাড়ছে ১৪২ শতাংশ
নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার। ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রেডে মূল বেতন বাড়ছে প্রায় ১৪২ শতাংশ।
অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হচ্ছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, যা ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি।
এর ফলে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতনের ব্যবধানও কিছুটা কমছে। আগের ১:১.৯৪৫ অনুপাত নেমে দাঁড়াবে ১:১.৭৮-এ।
নতুন স্কেলের আওতায় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী আসবেন।
বাড়তি আয় কি মূল্যস্ফীতি বাড়াবে?
সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে বাজারে ভোগ ও চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে উৎপাদন না বাড়লে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
তাই পে-স্কেলের পাশাপাশি শিল্প, কৃষি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মানুষের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি পণ্য ও সেবার উৎপাদন বাড়ানো যায়, তাহলে অতিরিক্ত চাহিদার চাপ সামাল দেওয়া সহজ হবে।
সরকারের সামনে চার বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর সরকারের সামনে মূলত চারটি বড় পরীক্ষা থাকবে।
প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি আয় যেন বাজারে পণ্য ও সেবার দাম আরও বাড়িয়ে না দেয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রাজস্ব আয় বাড়ানো: প্রতিবছর অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার স্থায়ী ব্যয় সামলাতে সরকারের আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই। শুধু ঋণ নিয়ে এই ব্যয় মেটানো হলে ভবিষ্যতে সুদ ও ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে।
তৃতীয়ত, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি: আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানো না গেলে অর্থনীতিতে চাহিদার চাপ তৈরি হতে পারে।
চতুর্থত, দুর্নীতি ও সরকারি অপচয় কমানো: বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি সেবার মান, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করতে না পারলে নতুন পে-স্কেলের সুফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়ার মতে, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বড় হারে বেতন বাড়ানো ইতিবাচক। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো চালু করলেই দুর্নীতি বন্ধ হয় না। দুর্নীতির বড় অংশ ক্ষমতা ও প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় শুধু মাসিক বেতন দিয়ে এর সমাধান সম্ভব নয়।
তার মতে, সরকারি চাকরি আইন ও শৃঙ্খলা-আপিল বিধিমালার দুর্বলতা দূর করার পাশাপাশি প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কারও জরুরি।
সব মিলিয়ে নতুন পে-স্কেল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নিঃসন্দেহে বড় স্বস্তির খবর। তবে এর স্থায়ী আর্থিক দায় সামলানোই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বেতন বাড়ানোর সুফল যেন একদিকে সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নত করে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ও ঋণের বোঝা বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন চাপ তৈরি না করে—সেই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ।
এম