স্তন ক্যানসারে সচেতনতা প্রয়োজন

  • কবিতা রাণী মৃধা | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২১, ০৯:১৮ পিএম
স্তন ক্যানসারে সচেতনতা প্রয়োজন

ঢাকা : আমাদের মতো অনুন্নত দেশে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে ‘ক্যানসার’ একটি ভীতিকর রোগের নাম। এর মূল কারণ রোগ সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং কুসংস্কার। স্তন ক্যানসার সম্পর্কে কথাটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য। সারাবিশ্বে স্তন ক্যানসার মহিলাদের অন্যতম প্রাণঘাতী রোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হলে মনগড়া ধারণা বা বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কারে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা রোগীদের মাঝে সচরাচর পরিলক্ষিত হয়। এজন্য প্রয়োজন এ সম্পর্কে যথাযথ ধারণা এবং প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন।

আশার কথা, সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের নারীরা স্তন ক্যানসার সম্পর্কে আগ্রহী হচ্ছেন এবং সময় থাকতেই সচেতন হচ্ছেন। স্তন ক্যানসারকে কীভাবে মোকাবিলা করতে হয় এবং প্রাথমিক অবস্থায় একে শনাক্ত করে এর ভয়াবহতা হতে কীভাবে পরিত্রাণ লাভ করা যায়, সেটি জানা খুবই প্রয়োজনীয়, বিশেষ করে নারীদের জন্য।

আমাদের দেশে যথাযথ তথ্য সংরক্ষণ না হলেও কিছু বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম এবং কিছু গবেষণায় এ রোগের প্রবণতা ও ভয়াবহতা লক্ষ করা যায়। আহসানিয়া ক্যানসার হাসপাতালের সূত্র অনুযায়ী দেশে প্রতি বছর ৩৫ হাজার নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন। দেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১০ লাখ ক্যানসার রোগীর মধ্যে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৯৯০ হতে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজার রোগীর মধ্যে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা শতকরা ১৫.৮৫% এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৭%। যদিও আমাদের দেশে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সার্বিক চিত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এ রোগে আক্রান্তের হার দিন দিন বাড়ছে।

এ রোগে মধ্যবয়সী মহিলারা বেশি মৃত্যুবরণ করেন। প্রতি ১০ জন মহিলার মধ্যে অন্তত ১ জন স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারেন। সারাবিশ্বে প্রতি ২ মিনিটে ১ জনের স্তন ক্যানসার শনাক্ত হচ্ছে। প্রতি ১৪ মিনিটে ১ জন স্তন ক্যানসারে মৃত্যুবরণ করছেন। বারো বছরের আগে মেয়েদের মাসিক হলে তাদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনা বেশি। আবার পঞ্চাশ বছর পরও যাদের মাসিক চলতে থাকে তাদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ত্রিশ বছরের পরে প্রথম সন্তান হলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে। মায়ের রক্ত সম্পর্কিত কারো যদি স্তন ক্যানসার হয় সেক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি থাকে। অত্যধিক ধূমপান/মদ্যপান স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

বয়সভেদে ঝুঁকির পরিসংখ্যান এমন—২০ বছর বয়সের মধ্যে প্রতি ২২ হাজারে ১ জন; ৪৫ বছর বয়সের মধ্যে প্রতি ১০০ জনে ১ জন; ৬৫ বছর বয়সের প্রতি ১৭ জনে ১ জন; ৮০ বছর বয়সের মধ্যে প্রতি ১০ জনে ১ জন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই রোগের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। স্তন ক্যানসারের গুরুত্বপুর্ণ লক্ষণসমূহ হচ্ছে—ব্যথাবিহীন স্তনের চাকা/দলা/গোট; স্তনের আকার/আকৃতির যেকোন ধরনের পরিবর্তন; স্তনের বোটা হতে রক্ত, রস বা কস বের হওয়া; স্তনের চামড়া কুঁচকে যাওয়া বা কমলালেবুর খোসার মত হওয়া; স্তনের বোঁটা ভেতরে ঢুকে যাওয়া এবং একদিকে সরে যাওয়া; এবং বগলের গাঁট শক্ত হয়ে ফুলে যাওয়া।

নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা জরুরি। ২০ বছর বয়স হতে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময়ে নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করতে হবে। মাসিক শুরুর ৫ থেকে ৭ দিন পর সাধারণ এই পরীক্ষা করতে হবে, যখন স্তন নরম এবং কম ব্যথা থাকে। বয়সের কারণে যাদের মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে অথবা যেসব মহিলা গর্ভবতী তারা এটি করবেন, প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে। যারা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন তারা পরীক্ষাটি করবেন প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে, বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করানোর পর।

স্তন ক্যানসার নির্ণয়ের উপায় এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে রয়েছে মেমোগ্রাম বা স্তনের বিশেষ ধরনের এক্সরে; স্তনের আলট্রাসনোগ্রাম এবং চাকা বা টিউমার থেকে রস বা কোষ নিয়ে পরীক্ষা করলে এই রোগ ধরা সম্ভব। তবে চিকিৎসা হিসেবে সার্জারি করাটাই উত্তম এবং বাংলাদেশে অনেক হাসপাতাল ও ক্যানসার ইনস্টিটিউটে এটি করার ব্যবস্থা আছে। এছ াড়া কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোন থেরাপিও দেয়া হয় এই রোগের চিকিৎসা হিসেবে।

স্তন ক্যানসার প্রতিরোধের উপায়ও আছে। যেহেতু রোগটির নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা যায়নি। তাই এই রোগ এড়ানোর জন্য কয়েকটি নিয়ম মেনে চলার জন্য পরামর্শ হচ্ছে—জন্মনিরোধক বড়ি অল্পবয়স হতে ও বহুদিন (১০ বছরের বেশি সময়) ধরে না খাওয়া; স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনা থাকলে মেমোগ্রাফি করা, যেমন-ফ্যামিলিতে ব্রেস্ট ক্যানসার থাকলে; উচ্চমাত্রায় ইস্ট্রজেন থেরাপি নেওয়া থেকে বিরত থাকা; সন্তানকে বুকের দুধ পান করান; টাটকা শাকসবজি ও ফল খাওয়া; সন্দেহ হলে ক্যানসার সার্জনের শরণাপন্ন হওয়া এবং ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করা।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
[email protected]

 

Link copied!