ঢাকা : পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী জুম। জুম চাষ করে জীবনযাপন করে বলে এদের জুমিয়া বলা হয়। যুগ যুগ ধরে আদি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় জ্বালানি তেল, লবণ আর সাবান ছাড়া জুমের ফসল দিয়েই জীবনযাপন চলে পাহাড়িদের। এক দশক আগেও এক পাহাড়ে জুম চাষ করার পর ১০-১৫ বছর ওই পাহাড়ে আর কোনো চাষ হতো না। অনুসন্ধানে জানা যায়, জুম চাষের উৎপত্তি সুইডেন থেকে। তাই একে সুইডেন এগ্রিকালচারও বলা হয়। বাংলাপিডিয়ার মতে, বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার হেক্টর ভূমিতে জুম চাষ হয়। ২০১৭ সালের তথ্যমতে, তিন পার্বত্য জেলায় ৩৫ হাজারেরও বেশি জুমিয়া পরিবার এই জুম চাষের সঙ্গে জড়িত। অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাঙামাটি, ২০২০-এর তথ্যমতে, তিন পার্বত্য জেলায় মোট জুমিয়া কৃষকের সংখ্যা ৪২ হাজার ৯৩৭ জন। তার মধ্যে বান্দরবান ১৫ হাজার ৪৮ জন, খাগড়াছড়ি ৪ হাজার ৩৯০ জন এবং রাঙামাটিতে ২৩ হাজার ৫০০ জন প্রায়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পাহাড়ে জুম চাষ কমছে। কৃষকদের অনেকেরই চাষাবাদ সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রয়েছে। পাহাড়ে এক সময় কৃষি বলতে ছিল জুম চাষ। সারা বছরের খাদ্যের জোগান হতো জুম থেকে। জুম চাষিরা বিশেষ কায়দায় পাহাড়ে চাষ করতেন। জুম ছেড়ে এখন ফলদ বাগানে ঝোঁক তাদের। জুমের পাশাপাশি এখন চাষিদের কাজুবাদাম, কফি ও মাল্টা চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে বলে জানায় বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
পাহাড়-অরণ্য উপত্যকার জনপদ খাগড়াছড়ি। চেঙ্গী ও মাইনী অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই জনপদে কৃষি অর্থনীতির পরিধি বাড়ছে। সমতল ভূমির পাশাপাশি মাঝারি উচ্চতার পাহাড়ে চাষাবাদে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবন। খাগড়াছড়ি কৃষি সম্ক্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭৫ হাজার পরিবার কৃষির সাথে সরাসরি সম্পৃৃক্ত। কৃষি অর্থনীতিতে বছরের লেনদেন প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। বিশেষ করে আম, লিচু, হলুদসহ মসলা জাতীয় ফসল ও ধান উৎপাদনে ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছে। খাগড়াছড়িতে প্রতি বছর খাস অনাবাদি জমি কৃষি চাষের আওতায় আসছে। বিশেষত যেসব পাহাড় বছরের পর বছর অনাবাদি থাকত তা এখন আবাদের আওতায় আসছে। পাহাড়ি অঞ্চলে শিল্পাঞ্চল গড়ে না ওঠায় কৃষির প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। দুর্গম অঞ্চলের মানুষও এখন পরিকল্পিত ও বাণিজ্যিক কৃষি প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। ফলে কৃষিতেই মানুষের সমক্ষতা আসছে। খাগড়াছড়ির ৬৯ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে এখন চাষাবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে নিট ফসলি জমির পরিমাণ ৪৪ হাজার ৬শ হেক্টর। পাহাড়ের অম্লীয় ভাবাপন্ন মাটি ও টিলা ভূমিতে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পাওয়ায় ফলদ বাগানের সম্প্র্রসারণ হয়েছে বেশি। জেলায় আম, লিচু, ড্রাগন, কলা, কাঁঠাল, আনারসসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলের চাষ বেড়েছে। এক সময়ের অনাবাদি পাহাড়েও এখন আম চাষ হচ্ছে। ছোট-বড় আমবাগানের সংখ্যা ৭ শতাধিক। আম চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছে অনেকেই। লিচু বাগানের সংখ্যা প্রায় ৫শ। বছরে লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১০ হাজার ৫১৫ মে. টন, কলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৮৭ হাজার ৮শ ৭৫ মে. টন, আনারস উৎপাদন হয় প্রায় ২৫ হাজার ১১৬ মে. টন, কাঁঠাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৭৮ হাজার ১৫৬ মে. টন, মাল্টা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৮৯ মে. টন, বছরে ৫২ মে. টন ড্রাগন উৎপাদিত হয়, যার বাজার মূল্য এক কোটি ৫৬ লাখ টাকা। প্রতি বছরই ড্রাগন চাষ সম্প্র্রসারণ হচ্ছে। এ ছাড়া কমলা, লেবু, জাম্বুরা, আমলকী, তেঁতুলসহ বিভিন্ন ফল উৎপাদন হয়। কৃষি বিভাগ বলছে, বছরে আমসহ ফলদ অর্থনীতিতে লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৪শ কোটি টাকা। এর সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত প্রায় ২০ হাজার কৃষক ও বাগান উদ্যোক্তা।
পাহাড়ি মানুষের জীবিকার আদিম ও প্রধান উৎস : বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রাচীনতম পেশা হিসেবে বিবেচিত হয় জুম চাষ। তাই তাদের জুমিয়া বলা হয়। ধানি জমির অভাবে পার্বত্য আদিবাসীদের প্রায় সব সম্প্রদায়ের জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল পাহাড়ের উপযোগী জুম চাষ। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ৮০ ভাগই জুম চাষনির্ভর। তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে, ১৮১৮ সালের আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম চাষই একমাত্র কৃষি চাষ পদ্ধতি ছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেবে তিন পার্বত্য জেলা ৫ হাজার ৪৮০ বর্গকিলোমিটার অশ্রেণীভুক্ত বনভূমির সিংহভাগেই জুম চাষ করা হয়। তিন জেলার কমবেশি ৪৩ হাজার পরিবার জুম চাষনির্ভর। এর মধ্যে খাগড়াছড়ির প্রায় ২২ হাজার, রাঙামাটির প্রায় ১০ হাজার ও বান্দরবানে প্রায় ১৩ হাজার জুমিয়া পরিবার আছে।
পরিশ্রমে নারীরা এগিয়ে : কথিত আছে উপজাতি পুরুষরা কম পরিশ্রমী। জীবিকা নির্বাহের জন্য এখনো পাহাড়ি নারীরাই তাদের সংসারের হাল ধরে টিকিয়ে রেখেছেন। ঘর সামলিয়ে পাহাড়ে জুমচাষ, ফলের বাগান সৃজনসহ আর্থনৈতিক উন্নয়নে তারা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। রাঙামাটি, বিলাইছড়ি উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে উপজাতি নারীরা পুরুষদের মতো জুম ক্ষেতে কাজ করছে। জুমে বিভিন্ন সবজি ও ধান চারা রোপণ থেকে শুরু করে ঘরে তোলা পর্যন্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন তারা। একেবারে পুরুষের মতোই একটি থামি ও ব্লাউজ পরে জুমের ধান আহরণ করে। একজন পাহাড়ি নারী দিনের শুরুতে স্বামী সন্তানকে সামলিয়ে জুম চাষ কিংবা বাগানে কাজের জন্য চলে যান উঁচু উঁচু পাহাড়ের জুম ক্ষেতে। সারাদিন কাজ করে পাহাড়ি তরি-তরকারি নিয়ে বিকেলে বাড়িতে পৌঁছে রান্নাবান্নার কাজ সারেন। এভাবেই প্রতিদিনকার জীবনকে মানিয়ে নিয়েছেন পাহাড়ে বসবাসরত উপজাতি নারীরা।
ক্রিক পদ্ধতিতে চলছে চাষাবাদ : ক্রিক অর্থ হলো দুই অথবা তিন পাহাড়ের সঙ্গে বাঁধ দিয়ে জলাধার তৈরি করা। পার্বত্য চট্টগ্রামে মৎস্য চাষ উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে পাহাড়ের পতিত জমিতে ক্রিকের মাধ্যমে মাছ চাষসহ অন্যান্য চাষাবাদে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প নিয়ে পাহাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে মৎস্য বিভাগ। মৎস্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার ২৫ উপজেলায় দুই পাহাড়ের মাঝে ক্রিকের (ঘোনায় মাছচাষের জন্য বাঁধ) মাধ্যমে অর্থাৎ পাহাড়ি ঘোনায় মৎস্য চাষের এ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। ইতোমধ্যে প্রায় ৯৫টি ক্রিক নির্মাণ করা হয়েছে। আরো তিন শতাধিক ক্রিক নির্মাণের জন্য কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। সব ক্রিক নির্মাণ শেষ হলে শিগগিরই পার্বত্য এলাকায় মাছচাষের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সবাই। ক্রিক পদ্ধতির সুবিধাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মাছ চাষ করা। তা ছাড়া ক্রিকের পানি দিয়ে গৃহস্থালির কাজ করা, খাবার পানির ব্যবস্থা করা হয়। আর যে বাঁধটা দেওয়া হয়, তার সুবিধা নিয়ে শাক-সবজি চাষ করা, বাঁধের ওপর যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করা। মৎস্য বিভাগ পাহাড়ের মানুষকে এ কাজে সম্পৃক্ত করেছে। এ কাজের মাধ্যমে পাহাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুফলভোগীরা মাছ চাষের পাশাপাশি হাঁস-মুরগি পালন, শাক-সবজির চাষ করে অনেকটাই স্বাবলম্বী হয়ে উঠেতে শুরু করেছে। এখন জুমচাষের পাশাপাশি নতুন ‘ক্রিক পদ্ধতিতে চলছে পাহড়ের কৃষি। পার্বত্য এলাকার এই ক্রিকের প্রকল্প এত জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
মসলা চাষে আগ্রহ বাড়ছে পাহাড়ে : তিন পার্বত্য জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় উচ্চমূল্যের মসলা চাষে স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। এ এলাকার জমি মসলাজাতীয় ফসল ও ফলের বাগানের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এরই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড পার্বত্য এলাকার প্রান্তিক কৃষকদের জন্য গ্রহণ করেছে উচ্চমূল্যের মসলা চাষ পাইলট প্রকল্প। সূত্রে জানা গেছে, এক সময় পাহাড়ে মসলা বলতে শুধু আদা, হলুদের চাষকে বোঝাত। কিন্তু এখন পাহাড়ের কৃষকরা জুম চাষের পাশাপাশি বিভিন্ন রকমের মসলা চাষের দিকে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় উচ্চমূল্যের মসলা চাষ’ একটি পাইলট প্রকল্প। এটি ২০১৮ সালের জুন থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত চারবছর মেয়াদ। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় উন্নত জাতের মসলা যেমন- দারুচিনি, তেজপাতা, আলুবোখারা, গোলমরিচ, জুম মরিচ, ধনিয়া, বিলাতি ধনিয়া ইত্যাদি চাষাবাদ করে দেশের চাহিদা পূরণ করা যাবে। এসব ফসলের আবাদের ফলে কৃষকরা লাভবান হবেন এবং তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হবে।
আগ্রহ বাড়ছে ফলের বাণিজ্যিক চাষে : কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, তিন পার্বত্য জেলায় মোট জুমিয়া কৃষকের সংখ্যা ৪২ হাজার ৯৩৭ জন। তার মধ্যে বান্দরবান ১৫ হাজার ৪৮ জন, খাগড়াছড়িতে ৪ হাজার ৩৯০ জন এবং রাঙামাটিতে প্রায় ২৩ হাজার ৫০০ জন। চিম্বুক পাহাড়ে আগে যে পরিমাণে জুমচাষ হত এখন তা কমে আসছে। অনেকেই আম, পেঁপে ও বিভিন্ন জাতের কুলসহ লাভজনক ফসলের বাগান করছেন। তবে জুমক্ষেতে এক সাথে অনেক ফসল পাওয়া যায় বলে কেউ কেউ এখনো জুমচাষ করে যাচ্ছেন। আশার খবর হলো, জুম চাষে ফলন কম হওয়ায় পাহাড়িরা আম ও আনারসসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল চাষ করছেন। ফলে পার্বত্য এলাকায় বেড়েছে ফল উৎপাদন। আম্রপালি জাতের বাগান স্থাপনে পাহাড়ি এলাকায় এক বিপ্লব সৃষ্টি হয়েছে। এখানে পোকামাকড়ের উপদ্রব কম হওয়া ও মাটিতে রসের অভাবের কারণে এ আমের মিষ্টতা বেশি। বাগানি আমের ভালো দাম পাচ্ছে, আবাদে আরো উৎসাহিত হচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর মাল্টা-কমলা, বাতাবি ও অন্যান্য লেবুজাতীয় ফলের আবাদ দেখা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়িদের জীবন-জীবিকার অন্যতম উৎস কলা চাষ। আগে অনেকটা নিম্নমানের চাঁপাকলা কম যত্নে আবাদ করা হতো। এখন দৃশ্য অনেকটা পাল্টাচ্ছে। বাংলাকলা আবাদ প্রাধান্য পাচ্ছে। তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের দুর্গম এলাকায় বসবাসরত আদিবাসী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ লোকজন নির্ভরশীল কলা চাষের ওপর। পাহাড়ি এলাকায় লম্বা জাতের বহু বছরজীবী এক জাতের পেঁপে চাষ প্রচলন আছে। মূলত বসতবাড়ি ও জুমের ফাঁকে সীমিত আকারে এ ফলের চাষ চলছে। পার্বত্য জেলার অনেক বাগানের আধা ছায়া যুক্ত স্থানে লটকন চাষের প্রচুর সুযোগ আছে বিধায় ১৫-২০ ফুট দূরত্বে এ ফল বাগান সৃষ্টির মাধ্যমে অধিক আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
উচ্চফলনশীল জাতে উৎপাদন বাড়বে : দিনদিন জুমের উপযোগী পাহাড় কমে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। এক বছর এক পাহাড়ে জুম চাষের পর আবার একই পাহাড়ে ঘুরে আসতে হচ্ছে। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য কয়েক বছর বিরতি দেওয়ার সুযোগ থাকছে না। তাতে করে পাহাড়ে মাটির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এখন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন ছাড়া উৎপাদন বৃদ্ধির আর কোনো বিকল্প নেই। বৈজ্ঞানিক উপায়ে স্থায়িত্বশীল এবং অধিক উৎপাদনশীল জুম চাষের উপায় বের করার গবেষণা করছে বাংলাদেশ কৃষি ফাউন্ডেশন। এই গবেষণায় মূলত সার-কীটনাশকের পরিমিত ব্যবহারের মাধ্যমে একই জমিতে প্রতি বছর জুম চাষের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা হয়। গত চার বছর ধরে চলা গবেষণায় বৈজ্ঞানিক ও কৃষিবিদরা খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সফলতার মুখ দেখেছেন। এতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন জুমচাষিরাও। ভবিষ্যতে গবেষণাজ্ঞান সব জুমিয়ার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারলে পাহাড়ের জুম চাষে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে এবং জুমিয়াদের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন কৃষিবিদ ও কৃষি বিজ্ঞানীরা।
জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ড্রাগন চাষ : পাহাড়ে বাড়ছে বিদেশি ফল ড্রাগনের চাষ। স্বল্প সময়ে অধিক লাভজনক হওয়ায় বান্দরবানে জুম চাষ ছেড়ে ড্রাগন ফল চাষে ঝুঁকছেন পাহাড়িরা। চিম্বুক পাহাড়ের বসন্ত পাড়ায় বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন ফলের চাষ করে লাভবান হয়েছেন অনেকে। বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে জানা যায়, বিদেশি ফল হলেও পাহাড়ের জলবায়ু এবং মাটি দুটিই ড্রাগন চাষের জন্য খুবই উপযোগী। পাহাড়ে ড্রাগন ফল চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। পোকামাকড়ের আক্রমণ কম এবং পানির সেচ কম লাগায় এ চাষে আগ্রহী হচ্ছে পাহাড়িরা।
সম্ভাবনার কফি চাষ : বাংলাদেশও কফি চাষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। জানা গেছে, ২০০১ সালের দিকে খাগড়াছড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে কফি চাষ শুরু হয়, যা ইতোমধ্যে সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছে। খুব দ্রুতই গবেষণার সাফল্য হিসেবে বারি কফি-১ রিলিজ দেয়া হবে বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া কফি চাষ সম্ক্রসারণে কৃষি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এসব কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে সম্ভাবনাময় কফি চাষে বদলে যাবে পাহাড়ি জীবন। কৃষি সম্ক্রসারণ অধিপ্তরের সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান তিন পার্বত্য জেলায় ১০২ হেক্টর জমিতে কফি আবাদ হচ্ছে। যার মধ্যে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২১ টন কফি।
স্ট্রবেরি চাষে উজ্জ্বল সম্ভাবনা : পাহাড়ে টসটসে, রসালো, মিষ্টি ফল স্ট্রবেরি চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তামাক চাষ থেকে চাষিদের ফিরিয়ে আনতে পাহাড়ের মাটিতে স্ট্রবেরি চাষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে রাঙামাটি জেলা কৃষি সম্ক্রসারণ অধিদপ্তর সহযোগিতায় উদ্যোগী হচ্ছে জেলা পুলিশ বিভাগ। রাঙামাটি সুখী নীলগঞ্জ এলাকায় পুলিশ বিভাগের বাগানের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ, ঔষধিসহ বিভিন্ন গাছের বাগান। এসব মিশ্র ফলের গাছের পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে স্ট্রবেরি চাষ। উৎপাদিত স্ট্রবেরি দেখে আকৃষ্ট হচ্ছে স্থানীয় চাষীরা।
কাজু বাদাম চাষে নতুন আশা : শুধু বাদাম হিসেবেই নয়, কাজু ফলের (কাজু আপেল) খোসারও অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। এ থেকে উৎপাদিত তেল দিয়ে উৎকৃষ্ট মানের জৈব বালাইনাশক তৈরি করা সম্ভব, যা নিরাপদ ফসল ও খাদ্যোৎপাদনে অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে কাজু আপেলের জুসও বেশ জনপ্রিয়। ফলের রস সংগ্রহের পর অবশিষ্ট মন্ড বা ছোবড়া দিয়ে জৈব সার উৎপাদন করা যায়। ফলে সবদিক থেকেই কাজুবাদাম একটি লাভজনক কৃষিপণ্য। কৃষি সম্ক্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর বান্দরবানের ৪ দশমিক ৮ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে কাজুবাদাম উৎপাদন হবে। এর সঙ্গে যুক্ত আছেন ৭০০ কৃষক। সবচেয়ে বেশি বাগান রয়েছে থানচি ও রুমা উপজেলায়। রাঙ্গমাটিতে কাজুবাদাম উৎপাদন হচ্ছে ২০ হেক্টর জমিতে। এ জেলায় আবাদ বেশি হচ্ছে বাঘাইছড়ি ও নানিয়ারচর উপজেলায়। সূত্র আরো জানায়, পাহাড়ের পতিত ভূমিতে সামান্য পরিচর্যায় প্রতি হেক্টরে ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৮ টন কাজুবাদাম পাওয়া সম্ভব। গত বছর বান্দরবানে ৭ দশমিক ২ টন ও রাঙামাটিতে পাঁচ টন কাজুবাদাম উৎপাদন হয়েছে।
আরবের খেজুর চাষ : সৌদি আরবের মরুভূমিতে উৎপাদিত খেজুরের পরীক্ষামূলক চাষ করে সফল হয়েছে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, পাহাড়ের মাটিতে পরীক্ষামূলকভাবে সফল আরবের এই খেজুরের চাষ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে দেশ কৃষি ক্ষেত্রে আরো একধাপ এগিয়ে যাবে। পাহাড়ের মাটিতে আরবের এই খেজুর চাষের সফলতায় এখানকার কৃষকদের মাঝে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ। রাঙামাটি রাইখালীর পাহাড়ী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, ২০০৯ সালে সৌদি আরবের গাছ থেকে প্রায় কয়েকশ বীজ সংগ্রহ করে পরীক্ষামূলক ভাবে চারা উৎপাদন করে গবেষণার মাঠে রোপন করে সফল হন বিজ্ঞানীরা। সব গাছে এ বছর ফুল আসে এবং প্রচুর ফল ধরে যার আকার ও আকৃতি আরবের খেজুরের মতোই খুবই আকর্ষণীয়। রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের রাইখালীর কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের সূত্রে জানা যায়, আরবের এই খেজুরের পরীক্ষামূলক চাষের সফলায় পাহাড়ের কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটা নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
বিদেশি নাশপাতির চাষ : পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি ভূমিতে বিদেশি ফল নাশপাতি চাষের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চল ও সিলেটের পাহাড়ি ভূমিতে নাশপাতি চাষের সম্ভাবনা আছে বলে জানিয়েছেন খাগড়াছড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। নাশপাতি শীত প্রধান অঞ্চলের ফল হলেও পার্বত্য অঞ্চলের স্বল্প তাপমাত্রা এবং পাহাড়ে ঢালু সমতল অংশে চাষের উপযোগী। এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করে সফলতা পেয়েছে পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, খাগড়াছড়ি। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৩ সালে নাশপাতির জাত অবমুক্ত করেন। যার নামকরণ হয়েছে বারি নাশপাতি-১। অবমুক্তের পর নাশপাতির ফলন পার্বত্য অঞ্চলে চাষের উপযোগিতা পেয়েছে বলে মতো দেন সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা। এটি মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারলে পার্বত্য অঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা যুক্ত হবে।
লেখক : কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।
আপনার মতামত লিখুন :