ফাইল ছবি
ঢাকা: দেশের সবচেয়ে পুরানো রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ। দেশ স্বাধীনতার পূর্বেই এই দলটির জন্ম। শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শেখ হাসিনা। স্বাধীনতার পর দলটি পাড়ি দিয়েছে দীর্ঘপথ। এই দীর্ঘ পথে দলটি রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে ২৪ বছর। শেখ মুজিব চার বছর আর শেখ হাসিনা ২০ বছর। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই সংকটে রয়েছে দলটি। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেরই প্রশ্ন কোন পথে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। সরকার স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, আগামী নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারবে না। শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ পলাতক বা বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকে কারাগারে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কোন পথে? সামনে এখন এই প্রশ্ন।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর গত দুই দিনে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক মন্ত্রীর যে মনোভাব জানা যাচ্ছে, তা হলো আগামী নির্বাচনে যাতে দলটিকে অন্তর্ভুক্ত করে অনুষ্ঠিত হয়, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা। অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পতন ঘটানো ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলেও মনে করেন বিদেশে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের নেতারা। আর সেটা সম্ভব না হলে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন যাতে সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হতে না পারে, সেই চেষ্টা করবে দলটি।
এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কোন পথে—সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। কিন্তু দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব অনমনীয়, তাঁদের মধ্যে অনুশোচনা নেই। তবে এসব চেষ্টা ব্যর্থ হলে কী হবে, সেই বিষয়ে কোনো ধারণা নেই নেতাদের। এমনকি অতীত ভুলের বিষয়ে ক্ষমা চাওয়া কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিবাদ মেটানোর কোনো চেষ্টাও নেই তাঁদের।
ক্ষমতাচ্যুতের পর সরকার পতনের পেছনে বিদেশি শক্তির হাত রয়েছে এমন অভিযোগও করেছে দলটি। তবে সম্প্রতি ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিউজ ১৮-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর সরকার পতনে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো বিদেশি শক্তি ‘সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত’ ছিল না।
এদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর এক বিবৃতিতে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সরকারের সাজানো ট্রাইব্যুনাল এই রায় দিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা কোনো অপরাধ করেই বলেও জানিয়েছেন।
জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতন এবং শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর গত বছরের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে শত্রুতাপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ফলে এই সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের স্বাভাবিক সম্পর্ক হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না দলটির নেতারা।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে স্বল্প সময়ের জন্য ঝটিকা মিছিল করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়কে ঘিরে অনলাইনে ডাক দেওয়া ‘লকডাউন’, ‘শাটডাউন’ কর্মসূচির আড়ালে চোরাগোপ্তা ককটেল নিক্ষেপ ও গাড়ি পুড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগ। তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। এসব কর্মসূচিতে দলটির নেতা-কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করতে নিয়মিত অনলাইনে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন শেখ হাসিনা, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং কেন্দ্রীয় নেতারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত হচ্ছে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের হয়তো ভবিষ্যতে ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে। এমনকি আগামী নির্বাচনে স্বতন্ত্র কিংবা অন্য দলের হয়ে আওয়ামী লীগের কারও কারও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ফিরে আসা নির্ভর করছে দলটির বর্তমান নীতি ও কৌশল পরিবর্তনের ওপর। এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনার রাজনীতিতে কার্যকরভাবে ফিরে আসার সম্ভাবনা কম।
এই মুহূর্তে দলের বেশ কয়েকজন শীর্ষ স্থানীয় নেতা কারাগারে রয়েছেন। হাসিনাসহ শীর্ষ অনেক নেতা রয়েছেন বিদেশে। আর ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও পালিয়ে বেরাচ্ছেন। এর মধ্যেই বিদেশে থেকে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং সাবেক মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমও লকডাউন ও শাটডাউনের মতো কর্মসূচি ঘোষণা করে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঠে থাকার আহবান জানান। তবে কথা হচ্ছে নিজেরা বিদেশে নিরাপদে অবস্থান করে দেশের অবস্থান করা নেতাকর্মীদের লকডাউন আর শাটডাউনের ডাক দিয়ে বিপদে ফেলছেন না তো।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, ক্ষমতাচ্যুতের পর সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন শেখ হাসিন ও তার ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয়। সে সময় রাজনীতিতে আর না ফেরার ঘোষণা দিলেও পরবর্তী পর্যায়ে আবার নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কথা বলছেন জয়। যারা কারাগারে আছেন তারা এখন নিজেদের অস্বস্তি নিয়ে শংকায়। আর কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়ে বিদেশে অবস্থান করে নিরাপদে রয়েছেন। দেশের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে আরাম আয়েশের জীবন কাটাচ্ছেন। আর যেসব নেতাকর্মী দেশে আছেন তাদের বিভিন্ন আন্দোলনের ডাক দিয়ে বিপদের মধ্যে ফেলছেন। যদি কখনো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে তখন এই সব ছোটখাটো নেতাকর্মীদের খোঁজ রাখারও সময় থাকবে না তাদের। তাই স্থানীয় নেতাকর্মীদের সবার আগে নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করতে হবে।
পিএস
আপনার মতামত লিখুন :