শবে বরাতে যে ৬ আমল পালনের পরামর্শ দিলেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

  • ধর্মচিন্তা ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬, ১০:২৪ এএম
শবে বরাতে যে ৬ আমল পালনের পরামর্শ দিলেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

সারাদেশে আজ যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় পবিত্র শবে বরাত পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে শবে বরাতের ফজিলত, ভাগ্য নির্ধারণের বিষয় এবং করণীয় আমল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বিশিষ্ট ইসলামি আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ।

এক আলোচনায় তিনি বলেন, শবে বরাতে ভাগ্য নির্ধারণ হয়—এমন মত কিছু আলেমের মধ্যে রয়েছে। তবে কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে অধিকাংশ মুফাসসির ও ইমামের অভিমত হলো, মানুষের সারা বছরের তাকদির নির্ধারিত হয় মূলত লাইলাতুল কদরে।

ভাগ্য নির্ধারণ: শবে বরাত না শবে কদর?

শায়খ আহমাদুল্লাহ ব্যাখ্যা করে বলেন, সূরা দুখানের ৩ ও ৪ নম্বর আয়াতে ‘বরকতময় রাতে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হওয়ার’ কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোরআনের অন্যত্র, বিশেষ করে সূরা কদরে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—কোরআন নাজিল হয়েছে লাইলাতুল কদরে। সুতরাং যে রাতে কোরআন নাজিল হয়েছে, সেই রাতেই ভাগ্য নির্ধারণের বিষয়টি সংঘটিত হয়—এটাই ইমাম কুরতুবী (রহ.)সহ অধিকাংশ তাফসিরবিদের অভিমত।

তিনি বলেন, কিছু আলেম শবে বরাত ও শবে কদরের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করেছেন। তবে শক্ত দলিল ও গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী ভাগ্য নির্ধারণের মূল রাত হলো শবে কদর।

শবে বরাতে কেন আমল গুরুত্বপূর্ণ?

তবে তিনি স্পষ্ট করেন, আল্লাহ যেদিনই তাকদির নির্ধারণ করুন না কেন, একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো—নিজের নসিব যেন কল্যাণময় হয়, রিজিকে বরকত আসে এবং জীবনে প্রশান্তি থাকে—এই কামনায় আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া। এ লক্ষ্যেই শবে বরাত উপলক্ষে তিনি ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ আমলের কথা তুলে ধরেন।

শবে বরাতে করণীয় ছয় আমল

প্রথমত, ঈমান ও তাকওয়া অবলম্বন
তিনি বলেন, সারা বছর গুনাহ করে শুধু একটি রাতে কান্নাকাটি করে ভাগ্য বদলের আশা করা সঠিক নয়। বরং সারাবছর আল্লাহভীতি ও নেক আমলের চেষ্টাই প্রকৃত তাকওয়া। কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, কোনো জনপদ ঈমান ও তাকওয়া অবলম্বন করলে আল্লাহ তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতের দরজা খুলে দেন।

দ্বিতীয়ত, বেশি বেশি ইস্তেগফার
‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ রিজিকে বরকত দেন, দুশ্চিন্তা দূর করেন এবং নসিবে কল্যাণ দান করেন—এমন বহু হাদিস রয়েছে উল্লেখ করে তিনি সবাইকে বেশি বেশি ইস্তেগফারের আহ্বান জানান।

তৃতীয়ত, সন্তুষ্ট থাকা ও শুকরিয়া আদায়
আল্লাহ যা দিয়েছেন, তাতে সন্তুষ্ট থেকে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা নসিবে বরকত আনে। আল্লাহ নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন—শুকর আদায় করলে নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দেওয়া হবে।

চতুর্থত, সাদকা করা
সাদকা বিপদ দূর করে এবং জীবনে কল্যাণ বয়ে আনে। সামর্থ্য অনুযায়ী দান করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

পঞ্চমত, দোয়া করা
শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, কিছু তাকদির আল্লাহ দোয়ার মাধ্যমে পরিবর্তন করে দেন। তাই আল্লাহর কাছে নিয়মিত দোয়া করতে হবে—যেন অকল্যাণ দূর করে কল্যাণ লিখে দেন।

ষষ্ঠত, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা
সহিহ বুখারির হাদিস উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আয়ু ও রিজিকে বরকত চায়, সে যেন আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখে।

বিদআত ও ভুল প্রচলন থেকে সতর্কতা

শবে বরাতকে কেন্দ্র করে প্রচলিত কিছু আমল নিয়ে সতর্ক করে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, এ রাতে সমবেতভাবে সারারাত ইবাদত করা বা পরদিন নির্দিষ্টভাবে রোজা রাখার বিষয়টি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। তবে শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা সুন্নত, বিশেষ করে আইয়ামে বীজের রোজার ফজিলত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শবে বরাতে আল্লাহ তাআলা সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন—এ মর্মে কিছু হাদিস রয়েছে। যদিও কিছু সনদ দুর্বল, তবু এ রাতের একটি ফজিলত অস্বীকার করা যায় না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, এই রাতকে কেন্দ্র করে প্রচলিত সব কাজ শরিয়তসম্মত।

আতশবাজি, হালুয়া ও বাড়াবাড়ির সমালোচনা

শবে বরাত উপলক্ষে আতশবাজি, আলোকসজ্জা ও হালুয়া-রুটির প্রচলনের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, এসবের কোনো ভিত্তি কোরআন-হাদিসে নেই। হালুয়া খাওয়ার সঙ্গে নবীজির দাঁত শহীদ হওয়ার যে গল্প প্রচলিত, তা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও হাস্যকর বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সবশেষে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, শবে বরাত আমাদের আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার একটি সুযোগ। বিদআত ও কুসংস্কার পরিহার করে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে আমল করাই একজন মুমিনের প্রকৃত দায়িত্ব। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, যেন সবাইকে শুদ্ধ আমলের তৌফিক দান করা হয় এবং শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা পালনের সুযোগ দেওয়া হয়।

এম

Link copied!