২০৩৬ সালে টাকা ছাড়াই কি চলবে পৃথিবী!

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ০৯:০২ পিএম
২০৩৬ সালে টাকা ছাড়াই কি চলবে পৃথিবী!

ফাইল ছবি

“২০৩৬ সালের মধ্যে টাকার আর কোনো গুরুত্বই থাকবে না”-সম্প্রতি বিখ্যাত অর্থনৈতিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট-এর সম্পাদক জ্যানি মিন্টন বেডোসের সাথে এক সাক্ষাৎকারে এমনই এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। তাঁর এই দাবি ঘিরে প্রযুক্তি ও অর্থনীতি বিশ্বে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং রোবোটিক্স প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে মাস্ক মানবজাতির ভবিষ্যতের যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও তিনি এর পেছনে কিছু যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে-২০৩৬ সাল নাগাদ কি সত্যিই বিশ্ব থেকে প্রচলিত মুদ্রা বা টাকার প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে যাবে, নাকি এটি শুধুই ইলন মাস্কের একটি অতি-আশাবাদী কল্পনা?

কেন ফুরিয়ে যাবে টাকার প্রয়োজনীয়তা: মাস্কের যুক্তি
অর্থনীতিবিদদের মতে, টাকা বা মুদ্রা মূলত একটি বিনিময়ের মাধ্যম, যা বাজারে পণ্য বা সেবার 'ঘাটতি' সামাল দিতে ব্যবহৃত হয়। ইলন মাস্কের মতে, এআই ও রোবোটিক্স মানবজাতিকে এমন এক যুগে নিয়ে যাচ্ছে যেখানে এই ‘ঘাটতি’ বলতে কিছু থাকবে না; বরং তৈরি হবে ‘অসীম প্রাচুর্য’। চলুন মাস্কের মূল ভিত্তিগুলো নিয়ে কথা বলি

পণ্য ও সেবার অতিরিক্ত উৎপাদন:
মাস্কের ধারণা, ২০৩৬ সালের মধ্যে বিশ্বে ১০০ কোটিরও বেশি হিউম্যানয়েড (মানব আকৃতির) রোবট কাজ করবে। এআই-চালিত এই রোবটগুলো ক্লান্তিহীনভাবে মানুষের চেয়ে অন্তত পাঁচ গুণ বেশি গতিতে খাদ্য, বাসস্থান, পোশাক ও চিকিৎসা সামগ্রী উৎপাদন করবে।

উৎপাদন খরচ শূন্যের কাছাকাছি পৌঁছানো:
যখন শারীরিক শ্রম ও মেধা-দুটিই যন্ত্রের মাধ্যমে নামমাত্র খরচে পাওয়া যাবে, তখন পণ্যের উৎপাদন খরচ নাটকীয়ভাবে কমে শূন্যের কাছাকাছি চলে আসবে।

মুদ্রাস্ফীতি নয়, বড় হবে ‘ডিফ্লেশন’:
বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি হলেও মাস্কের দাবি, ভবিষ্যতে পণ্যের দাম এত দ্রুত কমবে যে ‘ডিফ্লেশন’ বা মূল্যসংকোচনই হবে প্রধান অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

মানুষকে আর চাকরি করতে হবে না:
মাস্ক মনে করেন, এআই ও রোবটের কল্যাণে মানুষকে আর বেঁচে থাকার জন্য চাকরি করতে হবে না। কাজ হয়ে উঠবে শখের মতো। ফলে প্রথাগত বেতনের প্রয়োজনীয়তা দূর হবে এবং সবাই অনায়াসে জীবনধারণের সুযোগ পাবে। সহজ কথায়, যদি বাতাসে অক্সিজেনের মতো সব পণ্য ও সেবা পর্যাপ্ত পরিমাণে বিনামূল্যে পাওয়া যায়, তবে তা কেনাবেচার জন্য ‘টাকা’ নামের কোনো মাধ্যমের আর প্রয়োজন থাকে না।
আপস

মাস্কের ভবিষ্যদ্বাণী ও বাস্তবতা
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাস্কের নামে ২০২৭ থেকে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত একটি নিখুঁত বছরভিত্তিক ভবিষ্যদ্বাণীর তালিকা ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মাস্ক কোনো নির্দিষ্ট সাক্ষাৎকারে ২০২৭ থেকে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত পুরো ১০ বছরের এমন বাঁধাধরা ক্যালেন্ডার ঘোষণা করেননি। প্রকৃতপক্ষে ভিভোটেক, পিটার ডায়ামান্ডিসের মুনশটস, ফোর্বস, দ্য ইকোনমিস্ট এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি সম্মেলনে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারগুলোকে একত্র করে ইন্টারনেটে এই তালিকাটি সাজানো হয়েছে।

মাস্ক অবশ্য বিভিন্ন সময়ে ৩ বছর, ৫ বছর বা ১০ বছরের সময়সীমার কথা বলেছেন। উদাহরণস্বরূপ: ২০২৮ নাগাদ: সফটওয়্যার কোডিংয়ে মানুষ এআইয়ের কাছে প্রতিযোগিতায় হেরে যেতে পারে। ২০২৯ নাগাদ: হিউম্যানয়েড রোবট অপটিমাস বিশ্বের সেরা সার্জনের চেয়েও দক্ষতার সাথে অস্ত্রোপচার করতে পারবে। ২০৩১ নাগাদ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পৃথিবীর সব মানুষের সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে।২০৩৬ নাগাদ: বিশ্ব অর্থনীতিতে টাকার গুরুত্ব বহুলাংশে কমে আসবে।


অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তিবিদদের সংশয়
ইলন মাস্কের এই স্বপ্নদর্শী তত্ত্ব শুনতে আকর্ষণীয় হলেও অনেক অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ একে ২০৩৬ সালের মধ্যে বাস্তবায়নে বড় বাধা দেখছেন। তাঁদের যুক্তি হলো: সীমিত সম্পদের ধারণা রোবট বা এআই হয়তো অসীম সেবা উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু জমি , প্রাকৃতিক শক্তি বা Energy, খনিজ পদার্থ এবং মানুষের মনোযোগের মতো বিষয়গুলো পৃথিবীতে চিরকালই সীমিত থাকবে। সীমিত এই সম্পদগুলোর বণ্টন নির্ধারণে কোনো না কোনো আর্থিক মানদণ্ড বা ‘টাকা’র প্রয়োজন থাকবেই।

মাস্ক অতীতেও অনেক প্রযুক্তির সময়সীমা নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী ছিলেন (যেমন স্বয়ংক্রিয় চালকবিহীন গাড়ি)। গবেষণাগারে এআই বা রোবোটিক্স সফল হলেও সেটিকে বিশ্বজুড়ে ১ বিলিয়ন হিউম্যানয়েড রোবটে রূপ দেওয়া এবং কারখানায় বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করার আইনি, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাধা পার হতে কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে। শীর্ষ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান মরগান স্ট্যানলির মতে, ১০০ কোটি হিউম্যানয়েড রোবটের পর্যায়ে পৌঁছাতে ২০৫০ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

 যন্ত্র সব উৎপাদন করলেও তার মালিকানা থাকবে গুটিকয়েক বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে। সেই সম্পদ বিশ্বের প্রতিটি মানুষের কাছে সমানভাবে বণ্টন নিশ্চিত করা একটি বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০৩৬ সালের মধ্যে টাকা পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় বা বিলুপ্ত হয়ে যাবে-এই দাবিটি কিছুটা অতিরঞ্জিত এবং মাস্কের অতি-আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্সের দ্রুত বিকাশ মানুষের অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনছে।

২০৩৬ সালে হয়তো টাকার ব্যবহার একবারে বন্ধ হবে না, কিন্তু অর্থ উপার্জন, চাকরি এবং সঞ্চয়ের প্রথাগত সংজ্ঞা যে অনেকটাই বদলে যাবে-ইলন মাস্কের এই মৌলিক পূর্বাভাসের সঙ্গে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই একমত। পরিবর্তনটি কত বছরে ঘটবে তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সেই যন্ত্রনির্ভর ও প্রাচুর্যের পৃথিবীর সামাজিক কাঠামোর জন্য মানবজাতি কতটা প্রস্তুত?

এসএইচ 

Link copied!