ফাইল ছবি
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় গত দেড় দশকে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বাড়ানো হলেও কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। তবে কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখেই সরকারকে বিপুল ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে। এর প্রভাবে বারবার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি জ্বালানি পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের চেয়ে এলএনজি আমদানির অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি জোর দেওয়া হয়।
এসব নীতির তীব্র সমালোচনা করে ক্ষমতায় আসা বর্তমান বিএনপি সরকারও একই পথে হাঁটছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তারা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, এলএনজি আমদানির সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জ্বালানি খাতের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালে নেট জ্বালানি আমদানি মোট ব্যবহারের ৪৮.৪৮ শতাংশে উঠেছিল, যা বর্তমানে বেড়ে ৬৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অথচ ১৯৯০ সালে দেশের মোট ব্যবহৃত জ্বালানির মাত্র ১৪ শতাংশ আমদানি করতে হতো। সরকার পরিবর্তন হলেও আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও ভর্তুকির চাপ কমাতে নীতিগত পরিবর্তন না আনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, আগের প্রশ্নবিদ্ধ নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় দীর্ঘ মেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলমের মতে, সরকার পরিবর্তন হলেও জ্বালানি খাতের নীতিগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ স্পষ্ট নয়। কেবল কয়লা ও এলএনজিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, এতে আমদানিনির্ভরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়বে।
তিনি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যমান সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকির চাপ কমানোকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয় উল্লেখ করে তিনি জানান, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ভোক্তার ওপর চাপ বাড়লেও সংকট মিটবে না। এর জন্য নতুন কূপ খনন, অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো, বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থলভাগ ও সমুদ্রে অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা জরুরি।
বিদ্যুৎ খাতে ২০১০-১১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারকে ১ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি অর্থনীতি ও আর্থিক বিশ্লেষণ ইনস্টিটিউটের হিসাবে, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) প্রায় ১ লাখ ২৬ ৭০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়।
ব্যয় সামাল দিতে আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৪ দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ায়, যেখানে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিটের দাম ১৮৮ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। তা সত্ত্বেও ভর্তুকির চাপ কমানো যায়নি। বর্তমান বিএনপি সরকারও চাপ সামাল দিতে গত ৩ জুন বিদ্যুতের দাম ১৬.৬৮ শতাংশ বাড়িয়েছে। তবুও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের বাজারেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২০২২ সালের আগস্টে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে তৎকালীন সরকার ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ায়, যা পরিবহন ভাড়া ও মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির কারণে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হওয়ায় বর্তমান বিএনপি সরকারও দফায় দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তেলের দাম ৩৮.৩৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে ডিজেল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমলেও নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে গুরুত্ব কম দিয়ে এলএনজি আমদানির অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে গ্যাস কেনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সাথে সাথে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকি লাফিয়ে বাড়ে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি ছিল ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি ছাড় করা হয়েছে, যদিও পুরো বছরের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা যায়।
সংকট কাটাতে বর্তমান সরকারও এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করছে এবং ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের কুতুবজোমে টার্মিনাল স্থাপনে চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানির (সিএনইই) প্রস্তাব অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে।
অথচ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বাজেট বরাদ্দ ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা থাকলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৯১১ কোটি টাকা হয়। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ২ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা করা হলেও তার পুরোটা অনুসন্ধানে ব্যয় হয় না। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম. তামিম এ বিষয়ে বলেন, গ্যাসের সংকট কাটাতে শুধু এলএনজি আমদানি বা টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ালে চলবে না, দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রে নতুন গ্যাসের সন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অতিরিক্ত সক্ষমতা গড়ে তোলায় চাহিদা না থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ সক্ষমতা বসিয়ে রেখে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। যদিও ২০২১ সালে ৮ হাজার ৪৫১ মেগাওয়াট সক্ষমতার ১০টি প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র বাতিল করা হয়েছিল, বর্তমান বিএনপি সরকার পায়রা ও মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট করে নতুন দুটি কয়লাভিত্তিক ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এতে আরও ২ হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত হবে। পায়রা প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে চীনের এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়ন চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ২০২২ সালে নেওয়া ১৫০টি কূপ খনন কর্মসূচি ২০৩১ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বর্তমান সরকার। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে এবং দৈনিক ১৪ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বেড়েছে। তবে পেট্রোবাংলার সূত্রমতে, এর মধ্যে অধিকাংশ কূপের খননকাজ আগের সরকারের আমলেই সম্পন্ন হয়েছিল।
এসএইচ