সুপার এল নিনোর থাবা: দেশজুড়ে রেকর্ড তাপপ্রবাহ, সামনে মহাবিপদ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জুন ৫, ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম
সুপার এল নিনোর থাবা: দেশজুড়ে রেকর্ড তাপপ্রবাহ, সামনে মহাবিপদ

দেশজুড়ে চলমান তাপপ্রবাহ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দেশের অন্তত ৪৮টি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। অস্বাভাবিক এই গরমে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন, আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। পরিবেশবিদ ও আবহাওয়াবিদেরা সতর্ক করে বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে মানবজাতির জন্য সামনে মহাবিপদ অপেক্ষা করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র 'এল নিনো' এখন চরম শক্তিশালী রূপ ধারণ করেছে। তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় এটি ‘সুপার এল নিনো’তে পরিণত হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের আবহাওয়ায়। এর ফলে অতীতে যেখানে বছরে দুই-একবার চার থেকে পাঁচ দিনব্যাপী তাপপ্রবাহ দেখা যেত, এখন তা বছরে চার-পাঁচটি কিংবা তার চেয়েও বেশিবার আঘাত হানছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার দেশের পাঁচ বিভাগের ৪৮টি জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। এদিন দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় দিনাজপুরে, ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানীতে তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি মাসের সর্বোচ্চ। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত এই পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে এবং শনিবার থেকে তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে। তবে বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে ভ্যাপসা গরম ও অস্বস্তি এখনই কাটছে না।

পরিবেশ বিজ্ঞানী ও গবেষক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার এই পরিস্থিতিকে জলবায়ু পরিবর্তনের এক নিষ্ঠুর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, "অতীতে গ্রীষ্মকালে যে তাপমাত্রা দেখা যেত, এখন তার চেয়ে ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি বেশি দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে যে হিটওয়েভ বা তাপপ্রবাহ চলছে, তা অতীতের সংখ্যা, তীব্রতা ও ব্যাপ্তি—সব দিক থেকেই রেকর্ড ছাড়িয়েছে। আগে তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৮ ডিগ্রির মধ্যে থাকত, এখন তা ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রিতে উঠে যাচ্ছে। আর মানুষের শরীরে যে তাপমাত্রা অনুভূত হচ্ছে (ফিল লাইক টেম্পারেচার), তা প্রায় ৪৭ থেকে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্য।"

তিনি আরও জানান, আগে তাপপ্রবাহ এক সপ্তাহ স্থায়ী হলেও এখন তা ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হচ্ছে। গত চার বছর ধরে প্রশান্ত মহাসাগরে সক্রিয় সুপার এল নিনোর কারণে বাতাসে শুষ্কতা রয়ে গেছে। দেশের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে এমন উপাদানগুলোকে (জলাশয়, গাছপালা) ধ্বংস করে তাপমাত্রা বৃদ্ধিকারী উপাদানগুলোকে শক্তিশালী করার ফলেই এই বিপর্যয়।

ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী শরীফ জামিল জাতিসংঘের সতর্কবার্তা উল্লেখ করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে যে 'এক্সট্রিম ওয়েদার প্যাটার্ন' বা চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া তৈরি হচ্ছে, তাপপ্রবাহ তারই অংশ।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের দেশে দাবানল হয় না দেখে আমরা কিছুটা বেঁচে গেছি, তবে আমরা এখন 'প্ল্যানেট অব ইমার্জেন্সি' বা জরুরি গ্রহের মধ্যে আছি। দুর্ভাগ্যবশত, নীতিনির্ধারকেরা মানুষের এই দুর্ভোগ বা প্রকৃতির বিপদাপন্ন অবস্থা আমলে না নিয়ে ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্যে প্রকৃতি ও পরিবেশকে ব্যবহার করছেন। জীবাশ্ম জ্বালানির বিস্তার, দূষিত কলকারখানা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক দ্বন্দ্বের কারণে পৃথিবী ধ্বংসের মুখে পড়ছে। সামনে আমাদের জন্য মহাবিপদ অপেক্ষা করছে।"

বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও শ্রমনির্ভর জীবনযাত্রা সরাসরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই তাপপ্রবাহের বহুমুখী নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

জনজীবনে স্থবিরতা ও আয় হ্রাস: তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি হওয়ায় রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক ও কৃষিশ্রমিকেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। গরমে দীর্ঘক্ষণ কাজ করতে না পারায় তাদের কর্মঘণ্টা কমে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দৈনিক আয়ের ওপর।

মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি: তীব্র গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, কিডনির জটিলতা, হৃদরোগ ও ডায়রিয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় উচ্চ তাপমাত্রায় থাকলে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, যা হৃদযন্ত্র ও কিডনির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে।

কৃষি ও পোলট্রি খাতে লোকসান: প্রখর রোদে ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির হওয়ায় সেচ খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। অতিরিক্ত পাম্প চালানোর কারণে ডিজেল ও বিদ্যুতের খরচ বাড়ছে, যা কৃষকের মুনাফা কমিয়ে দিচ্ছে। অসহনীয় গরমে খামারে মুরগি মারা যাচ্ছে এবং ডিমের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিং: বাসা-বাড়ি ও শিল্প-কারখানায় এসি ও ফ্যানের ব্যবহার কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা এখন আকাশচুম্বী। জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত চাপের কারণে লোডশেডিং বাড়ছে, যা কলকারখানার উৎপাদন ব্যাহত করছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকট থেকে বাঁচতে এখনই পরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট বন্ধ করা এবং শহরগুলোতে গাছপালা ও খাল-বিল-নদী রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায়, ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

এম

Link copied!