• ঢাকা
  • শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭

টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে


আফসানা রিজোয়ানা সুলতানা জানুয়ারি ২৮, ২০২১, ১২:৪৪ পিএম
টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে

ঢাকা : বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। ২০১৯ সালের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির ৪০.৬% কৃষিতে নিয়োজিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুসারে বাংলাদেশের ৪৬.৬১% পরিবার কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবে বিশ্বব্যাংকের হিসাবমতে, বাংলাদেশের ৮৭% গ্রামীণ মানুষের আয়ের উৎস কৃষি। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি আসে প্রধানত ৫টি খাত থেকে যার মধ্যে কৃষি অন্যতম। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান ১৬.৬%। কৃষি ও বনায়ন খাত থেকে বাংলাদেশের জিডিপির ১০ শতাংশের বেশি অর্থ আসে যা টাকার অঙ্কে প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা।

উপরের আলোচনা থেকে এটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, আমাদের দেশের জনসংখ্যা এবং অর্থনীতির একটি বড় অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষিতে আমাদের সাফল্যও ঈর্ষণীয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে আমরা এখনো আমাদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। শুরু থেকেই আমাদের কৃষি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি এবং উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততার কারণে আমাদের কৃষি উৎপাদন বার বার ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার না করার ফলে ফলে বিগত বছরগুলোতে আমরা আমাদের আশানুরূপ ফলন পাইনি। বিশেষ করে ফসল কাটার সময় কৃষককে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। আবার জমিতে অধিক রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জমিগুলো ধীরে ধীরে উর্বরতা হারিয়েছে। নিকট ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তন নিঃসন্দেহে কৃষির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। তাই সঙ্গত কারণেই আমাদের এখন থেকেই একটি টেকসই কৃষিব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর প্রেক্ষিতে কিছু স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।

আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার না করে একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত কৃষকদের কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরো আগ্রহী করে তোলা এবং সেগুলো যথাসম্ভব সহজলভ্য ও সুলভ মূল্যে সরবারহ করা। জমি প্রস্তুতকরণ থেকে শুরু করে ফসল মাড়াই পর্যন্ত সমস্ত প্রক্রিয়াটি যান্ত্রিকীকরণ হলে কৃষকরা আরো বেশি লাভবান হবেন। এর ফলে সময় ও খরচেরও সাশ্রয় হবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে ফসলের উৎপাদন খরচ যেমন অনেকাংশে কমে যায় ঠিক তেমনিভাবে ফসলের নিবিড়তাও ৫-২২ ভাগ বেড়ে যায়। বীজ বোনার সময় বীজ বপন যন্ত্র ব্যবহার করলে প্রায় ২০ ভাগ বীজ সাশ্রয় হয়। অন্যদিকে ফসলের উৎপাদনও ১২-৩৪ ভাগ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া যন্ত্রের সাহায্যে ফসল কাটলে ফসলের অপচয় অনেক কম হয়, অর্থের সাশ্রয় হয়। ফলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পায়।

‘পারমাকালচার’ আধুনিক কৃষিতে একটি নতুন সংযোজন। পারমাকালচার শব্দটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত- পার্মানেন্ট এবং এগ্রিকালচার। পারমাকালচার দ্বারা মূলত স্থায়ী টেকসই কৃষি ব্যবস্থাকে বোঝায়। শুধু ফসল উৎপাদন করাই পামকালচারের মূল উদ্দেশ্য নয়। একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল হওয়ার অভ্যাসও গড়ে উঠে পারমাকালচারের মাধ্যমে। পারমাকালচারে প্রকৃতির কোনো ক্ষতি না করে টেকসই ও সুশৃঙ্খলিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করা হয়। এই পদ্ধতিতে কোনো একটি নির্দিষ্ট ফসল উৎপাদন না করে একসাথে অনেকগুলো ফসল উৎপাদন করা হয় যার ফলে সেখানে একটি বাস্তুসংস্থান গড়ে ওঠে। পারমকালচার পদ্ধতিতে ফসলের উৎপাদন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হয়। ফলে কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হন।

কৃষিতে ‘পারমাকালচারের’ মতো ‘জৈব কৃষির’ ধারণাটি নতুন নয়। কিন্তু এটি নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। ষাটের দশকের দিকে ‘সবুজ বিপ্লব’-এর নামে বিশ্বজুড়ে ক্রমাগত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার শুরু হয়। এর ফলে জমি হারিয়েছে তার উর্বরতা শক্তি, নষ্ট হয়েছে বাস্তুসংস্থান, হারিয়ে গেছে অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী। মাটিতে বসবাসকারী অণুজীবরা মাটিতে জৈব সার হিসেবে কাজ করে, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।  কিন্তু অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে এরা প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তাই এই পরিবর্তিত পরিস্থিতে আমাদের ফিরে তাকাতে হচ্ছে পেছনের দিকে। একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থার লক্ষ্যে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে জৈব কৃষি নিয়ে। মূলত জৈব কৃষি একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি যা ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি টেকসই পরিবেশের নিশ্চয়তা দেয়। এটি একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। এ উপায়ে উৎপাদিত ফসল বা পণ্য ‘অর্গানিক ফুড’। জৈব পদ্ধতিতে জমি চাষ করলে মাটি সবসময় উর্বর থাকে এবং এই উর্বরতা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। তাছাড়া এটি জমির জীব ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য বাড়াতে সহায়তা করে। জৈবকৃষিতে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে খামারজাত সার, কম্পোস্ট সার, আবর্জনা সার, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, হারের গুড়া, ছাই, কেঁচো ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। আর কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করা হয় পাতা, কাণ্ড, মূল বা বাকলের রস।

দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে একদিকে যেমন আমাদের খাদ্য চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি অন্যদিকে আমরা আমাদের চাষাবাদের জমি হারিয়ে ফেলছি।  এক্ষেত্রে বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্যের জোগান দিতে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ হতে পারে একটি বিকল্প পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে মাটি ছাড়াই ফসল চাষ করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে পানিতে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান যোগ করে পানিতেই ফসল উৎপাদন করা হয়। হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষ করে স্বাভাবিকের তুলনায় ২-৩ গুণ থেকে বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব। এই পদ্ধতিতে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করাও তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ।

বর্ষাকালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বড় অংশ পানির নিচে তলিয়ে যায়। তখন অনেক চাষাবাদের উপযোগী জমিও চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ একটি বিকল্প হতে পারে। যদিও দেশের কিছু কিছু অংশে ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয় কিন্তু এটি বড় আকারে বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। এই পদ্ধতিতে কচুরিপানা, দুলালীলতা, শ্যাওলা ও বিভিন্ন ঘাস একসাথে স্তূপ করে পচিয়ে ভাসমান বেড তৈরি করে সেখানে ফসল চাষ করা হয়।

টেকসই কৃষি ব্যবস্থার লক্ষ্যে আবহাওয়া সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা জরুরি। কৃষিকাজের সাথে আবহাওয়ার নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। উন্নত দেশে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্ট ফসল ফলানোর ক্ষেত্রে সে এলাকার বিগত কয়েক বছরের আবহাওয়া বিবেচনা করে উপযুক্ত ফসলের জাত বাছাই করে রোপণ করা হয়। যেহেতু কোনো এলাকার আবহাওয়া, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত, শিশির, বাষ্পীভবন, তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, মাটির গুণাগুণ এবং সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা বিবেচনা করে ওই এলাকার জন্য উপযুক্ত ফসলের জাত নির্বাচন করা হয়। তাই কৃষক পরিবেশ/প্রাকৃতিক কোনো কারণে সম্ভাব্য ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পান এবং ফসলের উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।

ফসল উৎপাদন ও কাটার পর স্বাভাবিকভাবেই তা ভোক্তার উদ্দেশ্যে বাজারজাত করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এই বাজার ব্যবস্থার মধ্যে একটি বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে।  যার কারণে কৃষক তাদের কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখেন না। বাজার ব্যবস্থার মধ্যে মধ্যস্বত্ব ভোগকারীদের অবস্থানের কারণে একদিকে কৃষক যেমন তাদের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, তেমনি ভোক্তারাও তেমন লাভবান হন না। লাভের প্রায় সবটুকুই যায় মধ্যস্বত্বভোগকারীর পকেটে। পাশাপাশি বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণ খাদ্যশস্য নষ্ট হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়, উৎপাদন থেকে বাজারজাত পর্যন্ত তার প্রায় ১৪% নষ্ট হয়, যার পরিমাণ প্রায় ৪২ লাখ টনের মতো। তাই একটি টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে  বাজারব্যবস্থাকে আরো উন্নত, আধুনিক এবং সময়োপযোগী করে তুলতে হবে।

উপরিউক্ত ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করে একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। টেকসই কৃষিব্যবস্থা আমাদের খাদ্যের নিশ্চয়তার পাশাপাশি টেকসই পরিবেশেরও নিশ্চয়তা দেয়, পাশাপাশি কৃষকও লাভবান হন। তাই আগামীর কথা চিন্তা করে দেশে এখন থেকেই গড়ে তুলতে হবে টেকসই কৃষিব্যবস্থা।

লেখক : শিক্ষার্থী, কৃষি অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।