• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭

বাংলা ভাষার বিকৃতি বন্ধ হোক


সাইফুল ইসলাম হাফিজ ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২১, ০২:১৭ পিএম
বাংলা ভাষার বিকৃতি বন্ধ হোক

ঢাকা : আমরা কি খাঁটি বাংলায় কথা বলতে পারি? আমাদের চোখের সামনে প্রতিনিয়ত হচ্ছে বাংলা ভাষার বিকৃতি। আমরা কি তা প্রতিরোধ করছি? অথচ বিশ্ববাসী আমাদের এক ভাষাপ্রেমী জাতি হিসেবেই চেনে। দিনদিন বাংলা ভাষার বিকৃতি হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে খুব সহজ করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা যখনই একে অন্যের সাথে কথা বলার জন্য বাংলা ভাষা ইংরেজিতে লিখে থাকি, সেই কথোপকথনের চিত্র দেখলে মনে হয় বাংলা ভাষার অস্তিত্বকে আমরা সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছি।

১৯৪৮ সালে করাচিতে নিখিল পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে পাকিস্তানিরা উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার প্রয়াসে আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব করেছিল। আমরা কিন্তু তাদের অযৌক্তিক প্রস্তাব গ্রহণ করিনি। হয়েছে প্রতিবাদ, আন্দোলন। কিন্তু এখন তরুণ প্রজন্মের বড় অংশই ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লিখছে প্রতিনিয়ত। যার প্রভাব পরীক্ষার খাতায়ও দেখতে পাওয়া যায়! কিন্তু কোনো মহল থেকেই এর কোনো প্রতিবাদ উঠছে না। ভাষা বিকৃত করার প্রবণতা তরুণদের মাঝে বেশ লক্ষণীয়। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মাঝেও ভাষাপ্রেম তেমন ফুটে উঠছে না। পরিবেশে নিজেকে একটু শিক্ষিত বা মার্জিতভাবে উপস্থাপন করার জন্য বাংলা কথার মাঝে ইংরেজি ব্যবহার করে থাকেন।

কিন্তু তাদের সামনে একজন কৃষক কিংবা রিকশাচালক যদি খাঁটি বা আঞ্চলিক বাংলা ভাষায় কথা বলেন তখন তথাকথিত শিক্ষিতরা তাদের ক্ষেত বলে। অফিস-আদালত, চলচ্চিত্র, নাটক, বিজ্ঞাপনসহ প্রায় জায়গাতেই চলছে বিদেশি ভাষার অবাধ ব্যবহার। বিদেশি ভাষার আগ্রাসনে খাঁটি বাংলা ভাষার চর্চা দিনদিন কমে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় আফসোসের বিষয় হলো, আমাদের সমাজে কিছু সুশীল ব্যক্তি আছেন যারা টকশো কিংবা  মোটিভেশনাল বক্তৃতায় বেশি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন। যার প্রভাব পড়ে দর্শক-শ্রোতাদের মাঝে। তারাও মিশ্র ভাষায় কথা বলতে শেখে। বেসরকারি বেতার কেন্দ্রগুলোর উপস্থাপকরা তো বাংলা বলেন না বললেই চলে! বর্তমানে বেশিরভাগ মানুষই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত আছেন। মোটামুটি সকলেই ইউটিউবের সাথে পরিচিত।

বেশিরভাগ তরুণ ইউটিউবার মিশ্র ভাষায় কথা বলেন, তাদের ইংরেজি উচ্চারণ ভালো হলেও বাংলা উচ্চরণ তেমন উন্নত না। বাংলা ভাষার বিকৃতির জন্য এসব মানুষ দায়ী। জনতার মাঝে বাংলা ভাষার এমন বিকৃত অবস্থা দেখেও সুশীল শ্রেণির চুপচাপ নীরবতা লক্ষ করা যাচ্ছে!

বছর দুয়েক আগে একটি ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে খেলার আয়োজন করেছিল। মঞ্চে দাঁড়িয়ে কে কত সময় খাঁটি বাংলায় কথা বলতে পারে। খেয়ালে-বেখেয়ালে বিদেশি ভাষা ব্যবহার করলেই সে হেরে যাবে। দেখা গেল কেউ তাতে টিকতে পারেনি। আমরা বেশিরভাগ লোকজনই বিশুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারি না।

তরুণরা পড়াশোনার জন্য ইংরেজি, আরবি শিখছেন। কেউবা ভাগ্যোন্নয়নে বিদেশে যেতে চীনা, কোরীয়, জাপানি, রুশসহ বিভিন্ন ভাষা শিখছেন। কিন্তু বাংলা ভাষার চর্চাটা একেবারেই ভুলে যাচ্ছেন। আমাদের সমাজের এমন অবস্থাই যেন প্রকাশ পায়—জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না।

বিদেশি ভাষা শেখা দোষের কিছু না বরং তা দেশের জন্য মঙ্গল। কিন্তু সর্বপ্রথম বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার শিখতে হবে। বাংলা ভাষাকে বিদেশি ভাষার সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। ইংরেজি, আরবি, উর্দু, হিন্দিতে কথা বলা যতটা না গর্বের খাঁটি বাংলায় কথা বলাটা তার চেয়ে বেশি গর্বের। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাংলা ভাষার বিকৃতি রোধে কাজ শুরু করতে হবে। বিশুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চা জোর দিয়ে শুরু করতে হবে। শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিংবা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে থাকলেই হবে না। বছরব্যাপী এই চর্চা চলমান রাখতে হবে।

বুকের তাজা রক্ত আর জীবনের বিনিময়ে অর্জিত মাতৃভাষা বাংলার বিকৃতি রোধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিকে অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। জনতার মাঝে বিশুদ্ধ বাংলায় লেখা সাহিত্যকর্মগুলো ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমেও পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। সবার মুখে বিশুদ্ধ বাংলার প্রতিধ্বনি উচ্চারিত হলেই ভাষাশহীদদের আত্মা শান্তি পাবে। বাংলা মায়ের হূদয়েও মিলবে প্রশান্তি।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।