• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২১, ২ বৈশাখ ১৪২৮
abc constructions

জলবায়ু সংকটের মোকাবিলা করতে হবে


আলম শাইন এপ্রিল ৭, ২০২১, ০২:২৪ পিএম
জলবায়ু সংকটের মোকাবিলা করতে হবে

ঢাকা : ‘জলবায়ু’ শব্দটা ব্যাপক পরিচিত হলেও অনেকেই শব্দটার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারেননি। বিষয়টি বোঝেন সবাই; কিন্তু বোঝাতে সক্ষম নন। যেমন— ‘জীববৈচিত্র্য’ শব্দের অর্থ বোঝেন; বোঝাতে পারেন না, তেমনি হচ্ছে জলবায়ু শব্দটি। জলবায়ুর ক্ষেত্রে একটা ছোট্ট হিসাব-নিকাশ আছে অবশ্য। হিসাবটি জানানোর আগে আমরা জেনে নিই জলবায়ুর উপাদানসমূহ। যেমন : বায়ু, বায়ুচাপ, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, মেঘ-বৃষ্টি, তুষারপাত, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ইত্যাদি জলবায়ুর উপাদান। আর ছোট্ট হিসাবটি হচ্ছে, কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের ২৫-৩০ (মতান্তরে ১০-১২) বছরের গড় আবহাওয়াই হচ্ছে জলবায়ু। অর্থাৎ দীর্ঘ মেয়াদি আবহাওয়ার পরিবর্তনটাই হচ্ছে মূলত জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তনকে আমরা সাধারণত ‘জলবায়ু সংকট’ বলে থাকি। এই জলবায়ু সংকটের কারণেই পৃথিবীর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে; বৈজ্ঞানিক ভাষায় যাকে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া বলা হয়। সর্বসাধারণের কাছে সেটি বৈশ্বিক উষ্ণতা নামেও পরিচিত।

জলবায়ুর প্রভাবের সঙ্গে আমাদের বেঁচে থাকার সম্পর্কটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে ২০১৯ সালের বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। অন্যান্য বছরের তুলনায় সেই বছরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি বিশ্ববাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে। যেমন : কুয়েতের তাপমাত্রা বিশ্বের ইতিহাসে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। সেখানে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। ফলে সেখানকার মানুষের বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বিষয়টা ভাবতেই রোম শিউরে উঠছে আমাদের। দেখা গেছে কুয়েতেই নয়, ভারত ও বাংলাদেশেও ব্যাপক তাপমাত্রা বিরাজ করেছিল ২০১৯ সালে। শুধু তা-ই নয়, ভারতের শতাধিক লোকের মৃত্যুর খবরও আমরা জানতে পেরেছি একই বছর। এসব হচ্ছে শুধু জলবায়ু সংকটের প্রভাবে। উল্লেখ্য বন্যা, খরা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি জলবায়ুর প্রভাবেই ঘটছে। নদীভাঙনের বিষয়টিও জলবায়ু সংকটের সঙ্গে সম্পৃক্ত। জলবায়ু সংকটের কারণে বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে যেমন, তেমনি সেসব ঘূর্ণিঝড়গুলো খুব শক্তিশালী হয়ে উপকূলে আঘাতও হানছে। আমরা ইতঃপূর্বে ১৯৯১ সালের সুপার সাইক্লোন, ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলা, ২০১৭ সালে ঘূর্ণিঝড় মোরার তাণ্ডবলীলা দেখেছি। আমরা দেখেছি অসংখ্য মানুষ, গবাদিপশু আর বন্যপ্রাণীর মৃতদেহ যত্রতত্র পড়ে থাকতে। আর আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ না-ই বা করলাম। তথাপি যে কথা না বললেই নয়, তা হচ্ছে জলোচ্ছ্বাসের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ভূমির লবণাক্ততা বৃদ্ধির কথা। যার কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে চাষাবাদে যেমন বিঘ্ন ঘটছে, তেমনি চিংড়িচাষে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে এসেছে। আবার অতিরিক্ত লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, গাছ-গাছালি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অপরদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের গড় বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেয়েছে আবার ভয়াবহ বন্যার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে নিম্নাঞ্চলগুলোতে। এ ভয়ংকর দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে শুধু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা জলবায়ু সংকটের জন্য মূলত দায়ী হচ্ছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর খামখেয়ালিপনা। সেই দেশগুলোর স্বেচ্ছাচারিতার খেসারত দিতে হচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে। তারা একদিকে কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে জলবায়ু সংকটের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহকে অনুদান দিচ্ছে। অনেকটা গোড়া কেটে জল ঢালার মতো। যার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হচ্ছে, আমাদের অনুদানের প্রয়োজন নেই, আমরা ভিক্ষা চাই না, আমরা চাই কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নেমে আসুক। আমরা চাই আমাদের প্রাণপ্রিয় সুন্দরবন টিকে থাকুক; টিকে থাকুক দক্ষিণ এশিয়ার গর্ব হিমালয় পর্বতমালাও।

সূত্রমতে জানা যায়, হিমালয়ের বরফও গলে যাচ্ছে দ্রুততর। ২০০০ সাল পর্যন্ত হিমালয়ের বরফ শতকরা একভাগ হারে গলেছে। বর্তমানে হিমালয়ের বরফ দ্বিগুণ হারে গলছে! তাতে চীন, ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটানসহ এশীয় অঞ্চলের শতকোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানির সমস্যায় পড়বে। উল্লেখ্য, ২০১৯ জার্মানির বন শহরে যখন জলবায়ু সম্মেলন চলছিল ঠিক তখনই ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এর রিপোর্টে এসব তথ্য প্রকাশ হয়েছিল।

আমরা জানি, সমগ্র বিশ্বে মোট মজুত পানির পরিমাণ ১ হাজার ট্রিলিয়ন টন। তার মধ্যে সমুদ্রে সঞ্চিত লবণাক্ত পানির পরিমাণ ৯৭দশমিক ২ শতাংশ, যা মোটেই পানযোগ্য নয়। অন্যদিকে ২ দশমিক ১৫ শতাংশ পানি জমাটবদ্ধ হয়ে আছে বরফাকারে। সেটিও পানযোগ্য নয়। বাকি দশমিক ৬৫ শতাংশ পানি সুপেয় হলেও প্রায় দশমিক ৩৫ শতাংশ পানি রয়েছে ভূগর্ভে, যা উত্তোলনের মাধ্যমে আমাদের দৈনন্দিন পানযোগ্য পানির চাহিদা পূরণ করতে হয়। এটি আমাদের কাছে বিশুদ্ধ পানি হিসেবে পরিচিত। এই পানির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে প্রতিটি মানুষের জন্যে দৈনিক গড়ে ৩ লিটার হারে। ভূগর্ভস্থ পানি ছাড়া নদ-নদী, খাল-বিল কিংবা পুকুর-জলাশয়ের পানি সুপেয় হলেও তা বিশুদ্ধ নয়। তবে সেটিও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। বিশেষ করে গোসলাদি, রান্নাবান্না, জামাকাপড় ধোয়ার কাজে এ পানির ব্যাপক প্রয়োজন পড়ে। তাতে করে একজন মানুষের সবমিলিয়ে গড়ে ৪৫-৫০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়।

অবধারিত বাস্তবতাটি হচ্ছে, বিশ্বের মোট আয়তনের তিনভাগ পানি হলেও বিশুদ্ধ পানি সংকটে ভুগছেন ৮০টি দেশের প্রায় ১১০ কোটি মানুষ। এ ছাড়াও প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় ১৮ লাখ শিশু প্রাণ হারাচ্ছে শুধু দূষিত পানি পান করে। বিশুদ্ধ পানির অভাবের নানা কারণ রয়েছে। এর মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, খরা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং আর্সেনিকের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। জানা যায়, বৈশ্বিক উষ্ণতা আর মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেই বিশ্বের ১৪৫ কোটি মানুষ সুপেয় পানির সংকটের মুখোমুখি হবে। তার মধ্যে এশিয়া মহাদেশে ১২০ কোটি এবং আফ্রিকা মহাদেশে ২৫ কোটি মানুষ এর আওতায় পড়বে। এর থেকে বাদ যাবে না ভারত-বাংলাদেশের মানুষও। বরং তুলনামূলকভাবে ভারত-বাংলাদেশ বেশি পানি সংকটে পড়বে। এ ছাড়াও অন্যান্য মহাদেশের তুলনায় এশীয় অঞ্চলে এর প্রভাব পড়বে খানিকটা বেশি। তার ওপর আমাদের জন্য মহা অশনি সংকেত হচ্ছে হিমালয়ের বরফ গলার হার দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়া। যেখানে ২৫ বছর আগে ৫০ সেন্টিমিটার বরফ গলেছে, সেখানে দ্বিগুণ হারে বরফ গলছে বর্তমানে। হিমবাহ গবেষকদের অভিমত, এই হারে বরফ গলতে থাকলে এশিয়ার কয়েকটি দেশের ১০০ কোটি মানুষ সরাসরি বিশুদ্ধ পানি সমস্যায় ভুগবে। এই দুর্যোগ থেকে উত্তরণের পথও বাতলে দিয়েছেন গবেষকরা। তারা স্পষ্ট বলেছেন, কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামাতে হবে। তাতে বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধ হবে। উষ্ণতা রোধ না হলে অবধারিত গ্রহান্তরিত হতে হবে মানুষকে। সুতরাং বুঝে নিতে হবে কোনটি আমাদের জন্য সহজতর; গ্রহান্তরিত, নাকি কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামানো।

প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, শিল্পোন্নত দেশের বলির পাঁঠা স্বল্পোন্নত দেশগুলো কেন হতে যাবে! বিষয়টি পর্যালোচনা করার জন্য বিশ্ববিবেকের কাছে আমাদের আবেদন রইল তাই। আমাদের আর্জি ‘কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনে আমাদের বাঁচতে দিন; আমরা বাঁচতে চাই।’ সবারই জানার কথা এই গ্রহের মায়ামোহ আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। এখানে আমাদের মুরব্বিরা শুয়ে আছেন। আমরা যেমন কাউকে ছেড়ে গ্রহান্তরিত হতে পারব না, তেমনি আমাদের আগামী প্রজন্মকেও একটি অরক্ষিত গ্রহে রেখে যেতে পারব না। আর মানুষ যদি না-ই বাঁচতে পারল, চাঁদ কিংবা মঙ্গল বিজয়ে কী হবে ঠিক বুঝতে পারছি না আমরা! কাজেই বিষয়টি নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি আমরা। কারণ এসব নিয়ে ভাবাভাবি কিংবা লেখালেখির সময় এখন আর নেই, সেই সময় ফুরিয়ে গেছে অনেক আগেই। অনেক লেখালেখি হয়েছে, অনেক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম হয়েছে এসব নিয়ে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তাই যা করার ত্বরিতগতিতেই করতে হবে এখন। কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনে মানবসভ্যতার জয়জয়কার ছড়িয়ে দিতে হবে। সুতরাং মুখে মুখে নয়, তা বাস্তবায়ন করে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিতে হবে মোড়ল দেশগুলোকে। তাহলে সার্থক হবে তাদের মোড়লিপনা, অন্যথায় এশিয়ার শতকোটি মানুষকে চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে হবে। এই চরম সত্যটাকে উপলব্ধি করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি আমরা। তবে ভালো খবর হচ্ছে, ইতোমধ্যে মরুর দেশ সৌদি আরব জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বকে রক্ষা করতে যুগান্তকারী দুটি উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। সম্প্রতি সৌদি যুবরাজ ‘সৌদি সবুজায়ন’ ও ‘মধ্যপ্রাচ্যের সবুজায়ন’ নামে দুটি বৃহৎ আকারের কর্মপরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছেন। তার মধ্যে সবুজায়নের লক্ষ্যে ১০ বিলিয়ন গাছ লাগানো ও ১৩০ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়াও সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য সবুজায়নের লক্ষ্যে ৫০ বিলিয়ন গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করেছেন। সৌদি আরবের এই পরিকল্পনা বিশ্বে দৃষ্টান্ত হতে পারে বলে আমাদের বিশ্বাস। বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশগুলো যদি এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে হয়তো কার্বন নিঃসরণের মাত্রা দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। তাই সেই লক্ষ্যে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি আমরা।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও বন্যপ্রাণীবিষয়ক লেখক

 

Haque Milk Chocolate Digestive Biscuit

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।

Wordbridge School