• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২১, ১৩ কার্তিক ১৪২৮

বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় পর্যটনশিল্পের বিকাশ প্রয়োজন


এ এইচ এম ফিরোজ আলী সেপ্টেম্বর ১১, ২০২১, ০৩:১১ পিএম
বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় পর্যটনশিল্পের বিকাশ প্রয়োজন

ঢাকা : বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প হচ্ছে পর্যটনশিল্প। সারা বিশ্বে কর্মসংস্থানের দিক থেকে এ পর্যটনশিল্প বর্তমানে সব চেয়ে বেশি এগিয়ে। বর্তমানে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে আয় প্রায় ৭৬ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলার।। পৃথিবীর অনেক দেশ প্রতি বছর অন্য যে-কোনো বড় শিল্পের চেয়ে পর্যটনশিল্প থেকে আয় করে বেশি। পর্যটনশিল্প এখন বিশ্বের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারি খাত। বিশ্ব পর্যটন সংস্থা ২০২০ সাল থেকে বিশ্বে প্রতি বছর ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করা হবে বলে মত দিয়েছিল। সারা বিশ্বের ১০০ মিলিয়ন মানুষ জীবন-জীবিকার সুযোগও সৃষ্টি করবে। বর্তমানে পৃথিবীতে ৭৫০ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে পর্যটকদের সংখ্যা ১০০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এই ১০০ কোটি পর্যটকদের মধ্যে ৫০ শতাংশ যাচ্ছে ইউরোপে, আর ২০ শতাংশ আসছে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। বাকিরা অন্য মহাদেশে যাতায়াত করছে। পর্যটনে বিশ্বের এমন সম্ভাবনাময় বাজার আকড়ে ধরে রাখতে ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, চীন, মালেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অনেক দেশ পর্যটনের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করছে। মালেশিয়ার জাতীয় অর্থনীতিতে পর্যটনশিল্পই বছরে অবদান রাখছে প্রায় ২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। ২০১৫ সালে ২৮.৮ মিলিয়ন পর্যটককে আকর্ষণের লক্ষ্য নেয় থাইল্যান্ড। নেপালের জাতীয় আয়ের ৪০ শতাংশ উৎস হচ্ছে পর্যটন খাত। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের সমীক্ষায় দেখা যায় ২০১৩ সালে জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান সিংঙ্গাপুরে ৭৫ শতাংশ, তাইওয়ান, হংকং, ফিলিপাইন ৫০ শতাংশের বেশি। মালদ্বীপের অর্থনীতির প্রায় পুরোটাই আসে পর্যটন খাত থেকে। ইন্দোনেশিয়া ও মেক্সিকোর মোট রপ্তানি আয়ের ৭০ শতাংশ আসে পর্যটন থেকে।

সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা অপরিসীম। স্বল্প আয়তনের জনবহুল এ দেশ হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে যুগে যুগে মুগ্ধ হয়েছেন পর্যটকরা। বাংলাদেশের পাহাড়-পর্বত, হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল, নদী-সাগর, প্রত্ন্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ঐতিহাসিক মসজিদ মিনার পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন, পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি অঞ্চলসহ নানা বৈচিত্রে ভরা আমাদের এই বাংলাদেশ। সমতল ভূমির অপরূপ সৌন্দর্যের এ দেশটির নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। ফলে বাংলাদেশে পর্যটনশিল্প মালেশিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।

পর্যটন শিল্পের বহুমাত্রিকতার কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনাও আছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাজস্ব খাতে পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য অনস্বীকার্য। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ২০১৬ সালে দেশের অভ্যন্তরে ৯৮ লাখ মানুষ পর্যটন স্পট সরজমিনে দেখতে যান। ট্যুরিজম কাউন্সিলের হিসাব মতে আমাদের দেশে সরাসরি পর্যটন খাতে কর্মরত আছেন ১৫ লাখ লোক এবং পরোক্ষভাবে আরো ২৩ লাখ লোক জড়িত। সব মিলিয়ে ৪০ থেকে ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে পর্যটন খাতে। আর এর আর্থিক মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ৪ হাজার কোটি টাকা।

১৯৮০ সাল থেকে আমাদের দেশে বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটন শিল্পের জন্ম হয়। প্রতি বছর ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যটন দিবস পালন করা হয়। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, চড়াই-উতরাই পার হয়ে দেশের পর্যটন শিল্পের অনেকটাই বিকাশ ঘটেছে। পর্যটন সূত্রের বরাতে গণমাধ্যমের তথ্য মতে আভ্যন্তরীণ পর্যটকদের সংখ্যা গড়ে প্রায় ৯৮ লাখ। চলতি বছর বাংলাদেশের পর্যটন খাত অন্যতম সমৃদ্ধিশালী শিল্পে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু বর্তমান করোনা মহামারীতে তা ক্ষতির সম্মুখীন হবে, এটাই স্বাভাবিক। তবু আশা রাখি ২০২৩ সাল নাগাদ জিডিপির ৬.৮ শতাংশ আসবে পর্যটন খাত থেকে। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের ২০১৬ সালের বার্ষিক গবেষণায় বলা হয়েছে ১০ বছর পর পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান হবে বিশ্বের মধ্যে ১৮তম। ২০২৬ সালে পর্যটন খাতে প্রত্যাশিত প্রত্যক্ষ জিডিপি দাঁড়াবে ৭৩৮.১ বিলিয়ন টাকা। পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ঘটলে বাংলাদেশের মানুষের বিশেষ করে গ্রামীণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশে পর্যটনের অপরিসীম সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরিবেশবান্ধব নীতিমালা না থাকায়, বিদেশীদের জন্য বিশেষ এলাকা গড়ে না তোলা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব, আবাসনের অপ্রতুলতাসহ ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার কারণে দেশের অর্থনীতিতে আশানুরূপ ভূমিকা পালন করতে পারছে না। বর্তমানে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দূষণ প্রক্রিয়া। দেশের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, টেকনাফ, কুয়াকাটা, সুন্দরবন সমুদ্র সৈকত সব চেয়ে বেশি দূষণের স্বীকার। একই অবস্থা রাঙ্গামাটির সাভলং ঝরনা, বান্দরবনের শৈলপ্রপাত ও বগা লেক। তারপরও নানাবিধ সমস্যা থাকা সত্ত্বেও আগের তুলনায় বর্তমান সময়ে পর্যটনশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পাল্টে দিচ্ছে।

২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্রে রূপ দিতে টেকনাফের সাবরাংয়ে ‘সাবরাং অর্থনৈতিক অঞ্চল’ নামে পর্যটন কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে পর্যায়ক্রমে গড়ে তোলা হবে আন্তর্জাতিক মানের সব সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন পর্যটন স্পট। এছাড়া নাফ নদীর বুকে জেগে ওঠা জালিয়ার দ্বীপের ২৭১ একর ভূমির ওপর গড়ে তুলা হচ্ছে নাফ ট্যুরিজম পার্ক। ইতোমধ্যে ৪৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০ কিলোমিটারের মেরিন ড্রাইভ কলাতলী হয়ে সাগরের কূল ঘেঁষে নির্মিত বিশ্বমানের সড়কটি সাবরাং অর্থনৈতিক অঞ্চলে গিয়ে শেষ হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পর্যটকদের পদভারে মুখরিত হবে এ অঞ্চল। ২০১৮ সালে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার পর্যটনে ২৭টি পর্যটন স্থানকে চিহ্নিত করে ৪৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এগুলো হচ্ছে মাধবকুণ্ড, রাতারগুল, মাধবপুর লেক, বিছানাকান্দি, পানামনগর, ময়নামতি, নীলাচল, মেঘলা অবকাশ কেন্দ্র, বগুড়া মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, কক্সবাজার, সুমংদুর্গাপুর, বিজয়পুর, কুয়াকাটা, ষাটগম্বুজ মসজিদ, টেকের ঘাট, শ্রীমঙ্গল ও বাকের টিলাসহ অন্যান্য স্থান।

বাংলাদেশের পর্যটন খাতে অগ্রগতি আনতে হলে সিঙ্গাপুর, মালেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, থাইল্যান্ডকে টার্গেট করতে হবে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে তাদের সকল কৌশল আমাদের প্রয়োগ করতে হবে। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মতে ইসলামিক দেশগুলোকে টার্গেট করে পর্যটক আকৃষ্ট করতে ট্যুরিজম বোর্ড কাজ করছে। পর্যটন কর্পোরেশনের মতে এ শিল্পের উন্নয়নে ৩৪ হাজার নারী ও পুরুষকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে পর্যটন এলাকার হোটেলে স্বল্পমূল্যে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা, পর্যটকদের নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিসহ একটি পরিবেশবান্ধব নীতিমালা তৈরি করে পর্যটকদের সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি করলে সম্ভাবনাময় এ শিল্প বাংলাদেশকে বদলে দেবে। আমরা সেই দিনের প্রত্যাশায়।

লেখক : প্রাবন্ধিক

Haque Milk Chocolate Digestive Biscuit

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।

Wordbridge School
Sonali IT Pharmacy Managment System