• ঢাকা
  • শনিবার, ২১ মে, ২০২২, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

কালুরঘাট রেল-সংযোগ সড়ক সেতুর বাস্তবায়ন জরুরি


এস এম মাঈন উদ্দীন রুবেল ডিসেম্বর ২৬, ২০২১, ১২:৫৭ পিএম
কালুরঘাট রেল-সংযোগ সড়ক সেতুর বাস্তবায়ন জরুরি

ঢাকা : চট্টগ্রাম শহরের দক্ষিণ দিকে বহদ্দারহাট থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কালুরঘাট ব্রিজ একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪ সালে) সৈন্য পরিচালনার জন্য কর্ণফুলী নদীতে ব্রিজের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ব্রিজ নির্মাণের অংশ হিসাবে ১৯৩০ সালে ব্রুনিক অ্যান্ড কোম্পানি ব্রিজ বিল্ডার্স হাওড়া নামক একটি প্রতিষ্ঠান ব্রিজ নির্মাণ কাজ শুরু করে। ১৯৩০ সালে শুধু ট্রেন চলাচলের জন্য ৭০০ গজ লম্বা কালুরঘাট সেতু উদ্বোধন করা হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যানবাহন চলাচলের সুবিধার্থে ব্রিজে ডেক বসানো হয়। দেশ বিভাগের পর ১৯৫৮ সালে ব্রিজটিকে সবরকম যানবাহন চলাচলের উপযোগী করে বর্তমান রূপ দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বহদ্দারহাটের কাছে স্থাপিত বেতার কেন্দ্রটি ঐতিহাসিক কালুরঘাট সেতুর কারণে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে এবং বেতার কেন্দ্রটিকে কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নামকরণ করা হয়। কালুরঘাট সেতু কর্ণফুলী নদীর উপর স্থাপিত একটি পুরাতন রেল ও সড়ক সেতু যা একসময় চট্টগ্রাম বিভাগের দক্ষিণাংশকে দেশের অবশিষ্টাংশের সঙ্গে সংযোগ রক্ষার একমাত্র উপায় হিসেবে বিবেচিত ছিল। ১৯৩০ সালে  কর্ণফুলী নদীর উপর দিয়ে জানালীহাট এবং গোমদণ্ডী রেলস্টেশনের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে স্টিল কাঠামোর উপর নির্মিত একটি সাধারণ সেতু হিসেবে কালুরঘাট সেতুটি তৈরি করা হয়। সেতুটির দৈর্ঘ্য ২৩৯ মিটার। চট্টগ্রাম ও দোহাজারী থানার মধ্যে ট্রেন চলাচলের উদ্দেশ্যে ১৯৩১ সালে সেতুটি উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের একত্রিশ বছর পর ১৯৬২ সালে জনগণের দুর্ভোগ বিবেচনা করে সেতুটিতে পাটাতন স্থাপন ও কার্পেটিং করে এটিকে রেলসেতুর পাশাপাশি একটি সড়ক সেতুতে রূপান্তর করা হয়।১৯৮৯ সালে  কর্ণফুলী সেতু (শাহ্ আমানত সেতু) নির্মিত হওয়ার আগপর্যন্ত কালুরঘাট সেতুটিই ছিল কর্ণফুলী নদীর ওপর দিয়ে দক্ষিণ চট্টলাসহ দক্ষিণাংশের সড়ক যোগাযোগের একমাত্র উপায়।

প্রয়াত সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ মঈন উদ্দীন খান বাদল কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘ ১১ বছর এমপি থাকাকালীন প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার দাবিকে আমলে নিয়ে এ সেতু নির্মাণে আশ্বস্ত করেছিলেন। শেষবার এমপি নির্বাচনে তার একমাত্র ইশতেহার ছিল এক বছরের মধ্যে কালুরঘাট রেলসংযোগ সড়ক সেতুর বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা। তা না হলে তিনি সংসদ থেকে পদত্যাগ করবেন বলেও স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পক্ষে আর কালুরঘাট সেতু দেখা হলো না, বছর পূর্তির আগেই তিনি কালুরঘাট সেতু করতে করতে পরলোক গমন করলেন। তৎকালীন এমপির পাশাপাশি আমাদের বর্তমান সংসদ সদস্য আলহাজ মোছলেম উদ্দীন আহমেদও চেষ্টা করেছিলেন সেতুর জন্য কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা নতুন সেতু পেলাম না। এখন জনসাধারণের মনে প্রশ্ন কেন এই সেতুর কাজ বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে? কেন এই সেতুর বাজেট একনেকে উঠে আসছে না? এই সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে কেন এত বাঁধা?

জানা যায়, অর্থায়ন ও নকশা চূড়ান্ত হলেও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আপত্তিতে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কর্ণফুলী কালুরঘাট নতুন সেতু। রেলের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে রেল মন্ত্রণালয় থেকে সাড়ে ৭ মিটার উচ্চতায় সেতুর নির্মাণের সিদ্ধান্তে আপত্তি ছিল না বিআইডব্লিউটিএ’র। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে নকশা ও বাজেটের চূড়ান্ত হওয়ার পর সেতুর উচ্চতা নিয়ে আসে আপত্তি। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ২০১৮ সালের নতুন নীতিমালা ১২ দশমিক ২ মিটার উঁচুতে সেতু নির্মাণের অনুরোধ জানানো হয়। এ নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি ও আলোচনা চলতে থাকে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী রেল সংযোগ সড়ক সেতু নির্মাণের নির্দেশ দেন। এরপর মূলত দ্বিতীয় কালুরঘাট সেতু প্রকল্পে গতি আসে।

বোয়ালখালী, পটিয়াসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি কালুরঘাট রেল সংযোগ সড়ক সেতুর বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের সচিব সেলিম রেজা ও মহাপরিচালক ইঞ্জিনিয়ার ডি এন মজুমদারের সঙ্গে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদ। গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ রেলওয়ের সচিব সেলিম রেজা বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর বহু আকাঙ্ক্ষিত কালুরঘাট রেল সংযোগ সড়ক সেতুটি বাস্তবে রূপ পাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে নতুন কালুরঘাট সেতু নির্মাণ করে দেবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। নতুন কালুরঘাট সেতুর নকশা তৈরির কাজ শেষ হলেই সেতু নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, উন্নয়নের রোল মডেল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের উন্নয়নে আন্তরিক এবং কালুরঘাট সেতু নির্মাণের বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সব কিছু ঠিক থাকলে অতিশিগগির কালুরঘাট রেল সংযোগ সড়ক সেতু নির্মাণ কাজ শুরু হবে।

এই একটিমাত্র সেতুই পাল্টে দিতে পারে বোয়ালখালী তথা দক্ষিণ চট্টগ্রামের চেহারা। বাড়াতে পারে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আয়তনও। সেই সাথে বোয়ালখালীসহ কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকাটি রূপ নিতে পারে নতুন শিল্প-বিপ্লব ও নগরায়ণে। এগিয়ে থাকবে শিক্ষা-দীক্ষায়ও, কারণ এই বোয়ালখালী রয়েছে ১৯৩৯ সালে নির্মিত দক্ষিণ চট্টলার উচ্চ শিক্ষার একমাত্র বিদ্যাপীঠ কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ। কিন্তু শুধু একমুখী সেতুর যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে তৎকালীন সুপরিচিত সুনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় কলেজও আজ পিছিয়ে আছে।  

এই বোয়ালখালীতে রয়েছে পাহাড়বেষ্টিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি জ্যৈষ্ঠপুরা, পর্যটন আকৃষ্ট কড়লডেঙ্গা পাহাড় ও চূড়া, পাহাড়ের উপর আছে বোয়ালখালী নামকরণকৃত মহান অলি হজরত শাহ বু-আলী কলন্দর শাহার আস্তানা শরীফ, মেধসমনি আশ্রম, বুড়া মসজিদ, গাউছুল আজম মাইজভান্ডারীর প্রসিদ্ধ সাত খলিফার দরবার, আহলা দরবার শরীফ, চরণদ্বীপ দরবার ও অসংখ্য অলি-আল্লাহর মাজার শরীফ যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন জেয়ারত ও ভ্রমণ করতে আসেন।

এই কালুরঘাট রেল সংযোগ সড়ক সেতু হলে শহরসহ রাউজান, রাঙ্গুনিয়াসহ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রবক্তা বীরকন্যা প্রীতিলতা সড়কের সঙ্গে দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ কক্সবাজারের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে। এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক জোন গড়ে উঠবে, প্রচুরসংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তাছাড়া দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত যে রেললাইন সমপ্রসারণ করা হচ্ছে, সেহেতু অতিশিগগির এই কালুরঘাট রেল সংযোগ সড়ক সেতুর কাজ বাস্তবায়ন না করলে ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। ফলে এত বড় প্রকল্পের কাজ শেষ করেও ট্রেন চলাচলে এই সেতু বাধা হয়ে দাঁড়াবে। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারীগামী ট্রেন ও ডেমু ট্রেন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে এই জরাজীর্ণ সেতুর ওপর। হঠাৎ এই সেতুর ওপর কোন দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায়ভার কে নেবে? একমুখী এই সেতুর ওপর মাঝেমধ্যে কোন যানবাহন বিকল হয়ে পড়লে তা অপসারণ না করা পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকা পড়ে শত শত যানবাহন। শহরগামী জনগণ পড়ে চরম ভোগান্তিতে। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন ও পঞ্চাশ হাজারেরও অধিক লোকজনের যাওয়া আসা এই সেতু দিয়ে।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের পর সবচেয়ে ব্যস্ততম শহর বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম শহরের অতি নিকটবর্তী এ সেতু। এ সেতু নির্মাণে এত বাধা কেন তা বোয়ালখালীবাসী তথা দক্ষিণ চট্টলার জনমনে বারবার প্রশ্নই থেকে যায়। বর্তমান সরকারের উন্নয়নে পাল্টে যাচ্ছে দেশের অলিগলি, গ্রাম হচ্ছে শহর। সেখানে আজো অবহেলিত বোয়ালখালী, বড় বাধা কালুরঘাট জরাজীর্ণ একমুখী সেতু।

মনে করেছিলাম মুজিব শতবর্ষে, স্বাধীনতার ৫০ বছরের সুবর্ণজয়ন্তীতে এ সেতুটির কাজের বাস্তবায়ন দেখব। কিন্তু তা আর হলো না, বছরটিই শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি বোয়ালখালী তথা দক্ষিণ চট্টলাবাসীর প্রাণের দাবি কালুরঘাট রেল সংযোগ সড়ক সেতুর অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন। তিনি যেন এই সেতুটি অতিসত্বর নির্মাণের জন্য আদেশ দেন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে যেন একনেকে পাশ করা হয়। আর এর মাধ্যমে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।

Wordbridge School
Sonali IT Pharmacy Managment System