• ঢাকা
  • শনিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২১, ১০ মাঘ ১৪২৭

করোনায় বন্ধের পথে ২০ শতাংশ রেস্তোরাঁ


নিজস্ব প্রতিবেদক নভেম্বর ২৭, ২০২০, ১১:৫৬ পিএম
করোনায় বন্ধের পথে ২০ শতাংশ রেস্তোরাঁ

ঢাকা : করোনা সংক্রমণের ভয়ে মানুষ খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হয় না। ফলে মানুষের মধ্যে বাইরে খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমেছে। এতে সমস্যায় পড়েছেন রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা। লকডাউনের কারণে এমনিতেই রেস্তোরাঁগুলো দীর্ঘদিন ছিল বন্ধ।

রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা জানান, স্বাস্থ্যবিধির কারণে বেশি গ্রাহককে বসতেও দেওয়া যাচ্ছে না। রেস্তোরাঁ ব্যবসা পার করছে কঠিন সময়। বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি বলছে সারা দেশে বন্ধের পথে রয়েছে ২০ শতাংশ রেস্তোরাঁ।

জানা গেছে, বেশির ভাগ রেস্তোরাঁ মালিকই ব্যক্তিগত তহবিল দিয়ে কোনোমতে ব্যবসা চালু রেখেছেন। যারা তা-ও পারছেন না তারা বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ বিক্রি করে দিয়েছেন প্রতিষ্ঠান। রাজধানীতে কী পরিমাণ রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে তার সঠিক হিসাব নেই। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় ১০ হাজার রেস্তোরাঁ আছে। সারা দেশে আছে ৬০ হাজারের ওপরে।

গত ২৬ মার্চ থেকে ঘোষণা করা হয় সাধারণ ছুটি। অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় হোটেল-রেস্তোরাঁও। রোজার সময় ২৮ এপ্রিল থেকে ইফতার বিক্রির অনুমতি দেয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। তবে শর্ত ছিল কেউ ফুটপাতে পসরা সাজাতে পারবে না। রেস্তোরাঁয় বসে ইফতারও খেতে পারবে না। এরপর থেকেই হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো মারাত্মক চাপে পড়ে। আয় শূন্যের ঘরে থাকলেও মাস শেষে ভাড়া এবং কর্মচারীর বেতন জোগাতে এখনো হিমশিম মালিকরা।

রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা জানান, শুক্রবার ছাড়া ক্রেতাদের আনাগোনা নেই বললেই চলে। করোনার কারণে বলা যায় ব্যবসা অর্ধেকে নেমে এসেছে। ভাড়া, বেতনসহ খরচের একটা বড় অংশই আসছে মালিকের জমানো টাকা থেকে।

অনেকেই জানান, করোনার কারণে রেস্তোরাঁর আয়তন ও বসার আসন অর্ধেকে নামিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। তার পরও ক্রেতা নেই। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে।  তা ছাড়া রেস্তোরাঁ ব্যবসা খারাপ হওয়ার সুযোগে ক্রেতারা এখন ফিক্সড দামের ওপর ডিসকাউন্ট চায় বলে কোনো কোনো রেস্তোরাঁ মালিক জানান। আমরা ৫ শতাংশ দিলে তারা ২০ শতাংশ চায়। কিছু কিছু জায়গায় ভাড়া কমানোর সুযোগ থাকলেও সব এলাকায় তা নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ধানমন্ডি এলাকার এক রেস্তোরাঁর স্বত্বাধিকারী জানান, আগে ভাড়া দিতাম ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা, এখন ১ লাখ ২০ হাজার। এর সঙ্গে দিতে হচ্ছে বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীদের বেতন। আগস্টে আমার ২ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। পরের মাসেও লস ছিল। এভাবে লোকসান দিয়ে কতদিন চালাতে পারব জানি না।

ম্যাডশেফের ব্রাঞ্চ ইনচার্জ ইশান আল মামুন জানান, আগে তাদের আসন সংখ্যা ছিল ৬০, কিন্তু করোনার কারণে কমিয়ে ৩৫ করা হয়েছে। বিক্রি কমেছে ৩০ শতাংশ। স্বাস্থ্যবিধির জন্য যোগ হয়েছে বাড়তি খরচ। ধানমন্ডির গুহা দ্য কেভ কিচেনের স্বত্বাধিকারী রাহাত হাবিব বলেন, ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত আমরা লসের মধ্যেই আছি। চলতি বছর এ পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। ৪ মাস লকডাউন থাকলেও ভাড়া দিতেই হয়েছে।

হার্ট ওয়ার্ল্ডের পরিচালক তাহসিন রব প্রিয়া বলেন, লকডাউনের আগেই আমরা ডাইনিং বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এরপর অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে আমরা হোম ডেলিভারি দেওয়া শুরু করলাম। লাকডাউনের কারণে ২-৩ মাস রেস্তোরাঁ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ওই সময় নিজেদের সুরক্ষিত রেখে কীভাবে রেস্টুরেন্ট চালাব সে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। অর্ধেক স্টাফকে অর্ধেক সবেতনে ছুটিও দিয়েছি।


লকডাউন তুলে দেওয়ার পর প্রথম মাসে আমরা মোটামুটি ক্রেতা পেয়েছি। কিন্তু পরের মাস থেকে ফের কমতে শুরু করেছে। তখন ভেবেছিলাম এভাবে চললে হয়তো ৩ মাস পর সামলে উঠতে পারব।

কিন্তু তেমনটি হয়নি। অনলাইনে ১০ শতাংশের মতো অর্ডার পেতাম। এখন ডাইনিং খুলে দেওয়ার পর সেটা আরো কমেছে। এর বড় কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ। এ ব্যবসার বড় ক্রেতা কিন্তু তরুণরা। এখন কোনোমতে টিকে আছি। বাড়িওয়ালা ভাড়া কমিয়েছেন। কিস্তিতে ভাড়া পরিশোধের সুবিধাও রেখেছেন।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, শুধু ধানমন্ডিতেই অনেক রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ কেউ মালিকানা হস্তান্তর করেছেন। বন্ধ হয়ে যাওয়ার তালিকায় আছে ইউ কি সেন্ট্রাল, ক্যাফে ফিফটি। এ ছাড়া ট্রিট ক্যাফে ও ক্যাফে দ্রুমের মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে। এ সবই হয়েছে করোনার কারণে। গত ২৮ জুন এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন।

দাবিগুলো ছিল-সাধারণ ছুটি নিয়ে গত ২৮ মে জারি করা প্রজ্ঞাপন সংশোধন করে খাদ্য, খাবার ও সেবার সঙ্গে হোটেল-রেস্তোরাঁ খাত স্পষ্ট করা, করোনাকালে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির যে বিল জমবে তা ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে প্রতি মাসে ১০ শতাংশ হারে আদায় করা এবং বকেয়া বিলের জন্য সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা, পোশাক খাতের মতো স্বল্প সুদে রেস্তোরাঁ মালিকদেরও ঋণ সহায়তা দেওয়া, নিম্ন আয়ের মানুষকে যে সহায়তা দিচ্ছে, তার আওতায় রেস্তোরাঁ শ্রমিকদেরও নিয়ে আসা এবং বাজেটে করোনা প্রকোপকাল ও প্রভাবকালের জন্য রেস্তোরাঁ ও দই-মিষ্টি খাতকে ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ দেওয়া।

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব এম রেজাউল করিম সরকার বলেন, যে পরিস্থিতি চলছে, তাতে সারা দেশে ২০ শতাংশ রেস্তোরাঁ বন্ধের উপক্রম হয়েছে। করোনার কারণে আমাদের মূল সমস্যা ছিল আস্থাহীনতা। ক্রেতারা সংক্রমণের ভয়ে রেস্তোরাঁয় আসা বন্ধ করে দিয়েছিল। সমস্যাগুলো আমরা সরকারকে জানিয়েছিলাম।

আমাদের সহযোগিতা করার জন্য বলেছিলাম। কিন্তু তা পাইনি। প্রধানমন্ত্রী প্রণোদনা ঘোষণা করলেও ব্যাংক আমাদের তা দিতে চায় না। আমাদের শ্রমিকরা কিছু পায়নি। আমরাও ঋণ নিয়ে যে কিছু করব সে উপায় নেই।

সোনালীনিউজ/এমটিআই