• ঢাকা
  • শনিবার, ২৮ মে, ২০২২, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

নিরাময় কেন্দ্রের আড়ালে ‘ভয়ংকর’ টর্চার সেল


বিশেষ প্রতিনিধি জানুয়ারি ৬, ২০২২, ০৩:১৯ পিএম
নিরাময় কেন্দ্রের আড়ালে ‘ভয়ংকর’ টর্চার সেল

ঢাকা : গাজীপুর শহরের একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে বন্দি অবস্থায় ২৮ জনকে উদ্ধার করেছে র‌্যাব। চিকিৎসার নামে তাদের বন্দি করে রাখা হয়েছিল।

গত মঙ্গলবার ভুরুলিয়া এলাকার ‘ভাওয়াল মাদকাসক্ত নিরাময় পুর্নবাসন কেন্দ্র’ থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়। এ সময় মালিক ফিরোজা নাজনীন বাঁধনসহ প্রতিষ্ঠানের পাঁচ কর্মচারীকে আটক করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ব্রিফিং করেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে ওই নিরাময় কেন্দ্রে ভোর থেকে অভিযান চালানো হয়। নিরাময় কেন্দ্রের আড়ালে এটি মূল একটি বন্দি ও নির্যাতনশালা। ২০ জনের অনুমোদন থাকলেও ভর্তি রাখা হতো অনেক বেশি মাদকাসক্তদের। বেড ছাড়াই ৪-৫টি কক্ষের মেঝেতে রাখা হতো গাদাগাদি করে। ঠিক মত দেওয়া হতো না খাবার। করানো হতো রান্নাবান্না-ধোয়ামোছার কাজ।

তিনি আরো বলেন, চিকিৎসার নামে চালানো হতো শারীরিক-মানসিক ও যৌন নির্যাতন। নির্যাতনের জন্য আলাদা কক্ষ পাওয়া গেছে। সেখানে নির্যাতন সামগ্রীও পাওয়া গেছে। ভর্তি রোগীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার কথা থাকলেও করা হতো না। কোনো ডাক্তারও নেই সেখানে। কয়েকজন মাদকসেবীকে দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করা হতো।

খন্দকার আল মঈন বলেন, প্রতিষ্ঠানের মালিকও মাদকাসক্ত। অভিযানের সময় নিরাময় কেন্দ্রে ৪২০ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে। অথচ এখানে মাদক থাকার কথা নয়। কেন্দ্রে আসার পর একজন মাদকাসক্তকে ২৮ দিনের বেশি রাখার নিয়ম নেই। অথচ কেউ কেউ এক থকে তিন বছর ধরে এখানে আছে। নানা অনিয়মের মধ্য দিয়ে ২০০৯ সাল থেকে এটি চলে আসছিল। উদ্ধারকৃতদের স্বজন বা অন্য নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়।

জানা গেছে, একটি প্রভাবশারী মহলের ছত্রছায়ায় এই নিরাময় কেন্দ্রটি পরিচালানা করা হত। জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে হাতে রেখে চলত নিময়ের নামে টাকা আদায়। ছয় বছর আগে নির্যাতনে এই কেন্দ্রে একজনের মৃত্যু হয়। সমপ্রতি একজন তরুণ চলচ্চিত্র অভিনেতাকে এ নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করানো হয়েছিলো। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আফরোজা নাজনীন বাধন অভিনেতাকে শরীর টিপে দেওয়াসহ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেন। রাজি না হলে শারীরিক নির্যাতন করেন। জানতে পেরে অভিনেতার স্বজনরা বিষয়টি র্যাবকে জানায়।

উদ্ধারের পর একাধিক যুবক নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, এখানো চিকিৎসার নামে বিত্তশালী পরিবারের সন্তানদের মাদক সেবনের সুযোগ দেওয়া হতো। নিরাপদে মাদক পাওয়ায় তারা নিরাময় কেন্দ্র ছেড়ে যেতে চাইতো না। মালিক বাধন প্রায়ই রাতে নিরাময় কেন্দ্রে থাকতেন। কোনো যুবককে পছন্দ হলে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করতেন। রাজি না হলে শারীরিক নির্যাতন চালাতেন। এছাড়াও সুস্থতার নামে নির্যাতন করা হতো রোগীদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নারী অভিভাবক বলেন, তার স্কুল পড়ুয়া একমাত্র ছেলেকে সাত মাস আগে এই কেন্দ্রে ভর্তি করেন। এ পর্যন্ত দেড় লাখ টাকা দিতে হয়েছে। কিন্তু ছেলের চিকিৎসার কোনো উন্নতি হয়নি। ছেলের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হতো না।

এদিকে শুধু ‘ভাওয়াল মাদকাসক্ত নিরাময় পুর্নবাসন কেন্দ্র নয়, মাদকাসক্ত রোগীদের সুস্থ করে তোলার বদলে নিরাময় কেন্দ্রগুলোয় অপচিকিৎসার নৈরাজ্য চলছে। বেশির ভাগ নিরাময় কেন্দ্রে রোগী পেটানো যেন নিয়মিত স্বাভাবিক ঘটনা। রিমান্ডের আসামির চেয়েও ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয় তাদের ওপর। এমনকি নির্যাতন চালানোর জন্য মারধরে বিশেষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মী বা বাউন্সার নিয়োগ দেয় অনেক নিরাময় কেন্দ্র। মানসিক হাসপাতালগুলোয় অলিখিতভাবে একই ব্যবস্থা আছে, যা অমানবিক ও বেআইনি।

খোদ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র চালাতে হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। কিন্তু রাজধানীতেই অসংখ্য প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স ছাড়াই নিরাময় কেন্দ্র চালাচ্ছে। আর যারা লাইসেন্স নিয়েছেন, তারাও নিয়মনীতির পরোয়া করেন না।

সূত্র জানায়, রাজধানীতে বেসরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা ১০৩টি। লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা করছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরও প্রায় ২০০। সারা দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অন্তত দেড় হাজার। এই বিশাল সংখ্যক নিরাময় কেন্দ্রের মধ্যে হাতেগোনা ৪/৫টি প্রতিষ্ঠান মানসম্পন্ন। বাকিরা নিরাময় কেন্দ্রের সাইনবোর্ডে ভিন্ন রকমের ব্যবসা খুলে বসেছেন।

এদিকে রোগীদের ওপর নির্যাতনের যত অপকৌশল প্রয়োগ করা হয়, তার অনেক কিছুই নারকোটিক্সের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে এ ধরনের বহু তদন্ত প্রতিবেদন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে জমা আছে। কিন্তু ওইসব প্রতিবেদন শুধু ফাইলবন্দি করা ছাড়া কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এখন এ বিষয়টিও সামনে এসেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা অনেক আগেই এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও সুপারিশ দিয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। কিন্তু ওই রিপোর্টগুলোর ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

মাঠপর্যায় থেকে নারকোটিক্সে পাঠানো প্রতিবেদনগুলোয় চিকিৎসার নামে এসব মারধরের বিষয়ে বলা হয়েছে, ওয়াটার থেরাপি (চোখ-মুখ বেঁধে নাকে-মুখে পানি ঢালা), ডা্লাবেড়ি পরিয়ে রাখা, দুই আঙুলের ফাঁকে শক্ত কাঠের শলাকা রেখে সজোরে চাপ দেয়া, হাত ও পায়ে নখ উপড়ে ফেলা, মাথার চুল কেটে দেয়া, শরীরে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেয়া হয় নিয়মিত। এতে অনেক রোগী গুরুতর আহত হন। কেউ কেউ মারা যান। কিন্তু সেগুলো আলোচনায় আসে না। অনেকে সামাজিক কারণে অভিযোগও করেন না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নেশার ঘোরে মাদকাসক্তরা অনেক সময় পশুর মতো আচরণ করে। কিন্তু বেশির ভাগ নিরাময় কেন্দ্রে উগ্র আচরণের সময় রোগীদের সামাল দেয়ার সক্ষমতা থাকে না। ফলে তারাও রোগীর সঙ্গে উগ্র এবং পশুর মতো আচরণ করে। অমানুষিকভাবে পিটিয়ে রোগীকে শান্ত করার নির্মম পথ বেছে নেয়। ভয়ানক নির্যাতনের কারণে রোগীর মধ্যে প্রচ্ল ট্রমা তৈরি হয়। নেশার জগৎ থেকে বের হওয়ার জন্য রোগী তখন মনোবল হারিয়ে ফেলে। ধীরে ধীরে সে মানসিক রোগীতে পরিণত হয়।

সূত্র বলছে, মাঠপর্যায়ে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর ওপর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের নজরদারি নেই বললেই চলে। নারকোটিক্স থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব প্রতিষ্ঠানের দেখভালের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সার্কেল ইন্সপেক্টর হলেও নিরাময় কেন্দ্র দেখভাল করে থাকেন সহকারী পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা। কিন্তু অধিদফতরে সহকারী পরিচালক পদ মর্যাদার কর্মকর্তার সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন। ফলে নিরাময় কেন্দ্রগুলোর পর্যবেক্ষণ সহকারী পরিচালকরাও করেন না। আবার সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব না থাকায় সার্কেল ইন্সপেক্টররাও নিরাময় কেন্দ্রমুখী হন না। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। একেবারে পর্দার আড়ালে থেকে গেছে ভয়াবহ এমন একটি দিক, যা আমাদের সবার চোখের সামনে ঘটছে।

সূত্র বলছে, রাজধানীর উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর এবং খিলগাঁও এলাকায় নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এসব এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য নিরাময় কেন্দ্র। কোনোটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত, কোনোটি লাইসেন্স ছাড়াই বীরদর্পে চালিয়ে যাচ্ছে ব্যবসা।

একবার নিরাময় কেন্দ্র খুলতে পারলে দু’হাতে টাকা কামানোর দীর্ঘমেয়াদি পথ খুলে যায়। শুধু তা-ই নয়, অভিযোগ আছে-এসব নিরাময় কেন্দ্র ও মানসিক হাসপাতালগুলোয় রোগীর সঙ্গে স্বজনদের দেখা-সাক্ষাতে রয়েছে বিশেষ কড়াকড়ি। বিশেষ করে নারী রোগী হলে এ ধরনের বেরিয়ার তৈরি করা হয়। এ নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শাখা থেকে জানা যায়, নিরাময় কেন্দ্রের লাইসেন্স পেতে অন্তত ১২টি শর্ত পূরণ করতে হয়।

এর মধ্যে সার্বক্ষণিক একাধিক চিকিৎসক, নার্স, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, প্যাথলজি, পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা, সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স ও চিত্তবিনোদন কেন্দ্র থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে ৯৮ শতাংশ নিরাময় কেন্দ্র এসবের ধারে-কাছেও নেই। বছরের পর বছর অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলে এলেও কেন্দ্রগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনতে পারছে না মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, একেক ধরনের নেশার ফলে মাদকাসক্তদের মধ্যে একেক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। যেমন ইয়াবা আসক্ত ব্যক্তির মধ্যে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, হেরোইনসেবীদের মধ্যে তা দেখা যায় না। আবার গাঁজাসেবীদের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হয়ে থাকে। ফলে ভিন্ন ভিন্ন নেশায় আসক্তদের চিকিৎসাও ভিন্ন হয়ে থাকে।

কিন্তু নিরাময় কেন্দ্রগুলোয় আসক্তি শনাক্তের ব্যবস্থা না থাকায় সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাও দেয়া যায় না। সব মাদকাসক্তের জন্য একই চিকিৎসা দেয়া হয়। বেশির ভাগ নিরাময় কেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসা দুর্ব্যবহার, ধমক, মারধর এবং নৃশংস নির্যাতন।

এর আগে পুলিশের এএসপি আনিসুল হককে পিটিয়ে হত্যা করা হলে মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলো আলোচনা আসে। ওই সময় কিছু অভিযান হলে অজ্ঞাত কারণে আবারও বন্ধ হয়ে যায়। তবে র্যাব বলছে, এবার তালিকা ধরেই অভিযান শুরু হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

Wordbridge School
Sonali IT Pharmacy Managment System