• ঢাকা
  • বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯

সহসা কাটছে না ডলার সংকট!


বিশেষ প্রতিনিধি আগস্ট ১৪, ২০২২, ০১:৫৮ পিএম
সহসা কাটছে না ডলার সংকট!

ঢাকা : দিনের পর দিন টাকার মান কমছে, বাড়ছে ডলারের দাম। ডলার-সংকট নিরসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। তারপরও কাটছে না ডলার সংকট।

বাজার ‘স্থিতিশীল’ করতে গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় নতুন অর্থবছরেও রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরমধ্যেও মাত্র কয়েক মাসের মাথায় টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া রেট অনুযায়ী বর্তমানে আন্তঃব্যাংকে ডলার লেনদেন ৯৫ টাকা। কিন্তু সে সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। বেঁধে দেওয়া দাম থেকে অনেক বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে ডলার। অভিযোগ রয়েছে ডলার বিক্রি কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী দালালচক্র। তাছাড়া ব্যাংকগুলোতে নগদ ডলার বিক্রি বন্ধ রয়েছে। এমনকি ব্যাংকগুলোতেও বিক্রি হচ্ছে না নগদ ডলার।

ফলে সবশেষ খোলাবাজারে বৃহস্পতিবার ১২০ টাকা ছুঁয়েছে এক ডলারের বিনিময়মূল্য। সামনে আরো বাড়বে এমন গুঞ্জনও আছে বাজারে। কারসাজিতে প্রতি ডলারের ১২৫ টাকার বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিস্থিতি আরো বেশি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, ডলারের এই অবস্থা সহসা কেটে যাবে এমনটা মনে করার কারণ নেই। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তের অভাব রয়েছে।

তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে আমদানির বিষয়ে নির্দেশনাসহ সরকারের নেওয়া উদ্যোগের সঠিক প্রয়োগ, স্বল্প এবং মধ্যমেয়াদে পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের কৌশল ঠিক করতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, নগদ ডলার কেনাবেচায় মানি চেঞ্জারের ওপর নির্ভরতা কমাতে, এবার সারা দেশের ব্যাংকগুলোর শাখায় শাখায় নগদ ডলারসহ বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে গ্রাহকরা ব্যাংকের যেকোনো শাখায় গিয়ে চাহিদা অনুযায়ী ডলার কেনাবেচা করতে পারবেন। এ বিষয়ে আজ রোববার বিস্তারিত জানাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ডলারের বাজার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায়। এ সময় মুদ্রাবাজার অনেকটা স্থিতিশীল থাকলেও ২০২১ এ এসে বেড়ে যায় আমদানি ব্যয়। ২০২১ সালের ২২ আগস্ট প্রথমবারের মতো এক ডলার ৮৫ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

এরপর চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি ৮৬ টাকা, গত ২৭ এপ্রিল ৮৬ টাকা ৪৫ পয়সা, গত ১০ মে ৮৬ ডাকা ৫০ পয়সা এবং সবশেষ গত ২৫ জুলাই প্রতি ডলার ৯৪ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।

চলতি মাসের শুরু থেকেই বাজারে দেখা দিয়েছে ডলার সংকট। বুধবার (১০ আগস্ট) ডলারের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গেলে সংকট রূপ নেয় চরমে। এদিন ডলার বিক্রি হয় ১১৯-১২০ টাকা দরে।

বৃহস্পতিবার (১১ আগস্ট) সকালে বেশিরভাগ মানি এক্সচেঞ্জে ডলার কিনতে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসতে হয় অনেক সাধারণ ক্রেতাকে। বিকেলের দিকে ডলারের দাম কিছুটা কমলেও, কমেনি ডলার সংকট।

যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক খোলাবাজারে ডলার কেনার পরিবর্তে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে জোর দেওয়ার কথা বলছে, তবে সাধারণ মানুষের বক্তব্য- অনেকের হাতেই ক্রেডিট কার্ড নেই, আর নগদ ডলার ব্যবহার কার্ডের চেয়ে বেশি সুবিধাজনক বলে জানান তারা।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, পল্টনে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটের উল্টো পাশে রয়েছে সবচেয়ে বড় সিন্ডিকেট। বাজারে ডলার সংকট হলেও তাদের কাছে নেই সংকট। নগদ টাকা পেলেই হাজির করা হয় বৈদেশিক মুদ্রা। কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে ডলারের ব্যবসা করছেন তারা।

কেবল মানি এক্সচেঞ্জার নয়, ডলার নিয়ে কারসাজিতে জড়িত খোদ ব্যাংক খাত। চলতি মাসেই বেশ কয়েকটি ব্যাংকের সন্ধান পাওয়া গেছে যারা বেশি মুনাফার লোভে প্রয়োজনের বেশি ডলার সংরক্ষণ করেছে।

এছাড়াও মতিঝিল এলাকার বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জের সামনে দেখা গেছে দালালদের আনাগোনা। ডলার বিক্রি কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী এক দালালচক্র।

মতিঝিল থেকে পল্টন মোড় পর্যন্ত রয়েছে অসংখ্য মানি এক্সচেঞ্জ কোম্পানি। স্বাভাবিক সময়ে ব্যাংকে ডলার না পেলে কিংবা কাগুজে ঝামেলা এড়াতে মানি এক্সচেঞ্জারদের দ্বারস্থ হন ক্রেতারা। কিন্তু এবার মানি এক্সচেঞ্জারেও পাওয়া যাচ্ছে না ডলার।

মানি এক্সচেঞ্জারে কেন ডলার নেই জানতে চাইলে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক মুদ্রা ব্যবসায়ী জানান, এখন ডলার মজুত করলেই লাভ। কারণ মঙ্গলবার (৯ আগস্ট) কার্ব মার্কেটে ডলারের দাম ছিল ১১৪-১১৫ টাকা।

বৃহস্পতিবার ১২০ টাকা দিয়েও ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। আরো দাম বাড়লে ব্যবসায়ীরা দ্বিগুণ লাভে ডলার বিক্রি করতে পারবে এ আশায় ডলার মজুত করে রাখছেন।

বায়তুল মোকাররম মার্কেটের আরেক মানি এক্সচেঞ্জার ব্যবসায়ী রাহাত বলেন, বুধবার (১০ আগস্ট) সকালে ডলার বিক্রি হয়েছে ১১৫ টাকা দরে। একই দিন বিকেলে এসে ডলারের দাম ৫ টাকা বেড়ে হয়েছে ১২০ টাকা। ডলারের দশা হয়েছে শেয়ারমার্কেটের মতো। দাম নিয়ে আপনি আগে থেকে কিছু বলতে পারবেন না। তবে ধারণা করা যাচ্ছে, ডলারের দাম আরো বাড়বে। কদিনের মধ্যে প্রতি ডলারের দাম দাঁড়াতে পারে ১২৫ টাকা। বেশি লাভের আশায় যাদের হাতে ডলার আছে, তারা আর বিক্রি করছেন না।

গত বৃহস্পতিবার, সরেজমিনে মতিঝিলের কয়েকটি ব্যাংকে ডলার কিনতে গেলে জানানো হয়, বর্তমানে নগদ ডলার বিক্রি বন্ধ রয়েছে। এ ব্যাপারে দিলকুশার জনতা ব্যাংকের সামনে কথা হয় হাসিবুল আলমের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ডলার কিনতে বেশ কয়েকটি ব্যাংকে গিয়েছিলাম। সবখানেই এক কথা- নগদ ডলার বিক্রি বন্ধ। ব্যাংকগুলো বলছে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের কথা। কিন্তু সবার হাতে তো ক্রেডিট কার্ড নেই।

ব্যাংকে ডলার না পেয়ে আশপাশের কয়েকটি মানি এক্সচেঞ্জে গেলে তারাও জানায় ডলার নেই। যাদের হাতে ডলার আছে, তারা অযৌক্তিক দাম হাঁকছেন।

ব্যাংকগুলোতে কেন ডলার বিক্রি করা হচ্ছে না- এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বেসরকারি এক ব্যাংকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, মূলত ব্যবসায়ীদের জন্য আমরা হাতে ডলার রাখছি। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও আমরা পর্যাপ্ত ডলার পাচ্ছি না। ডলারের জন্য অন্য ব্যাংকগুলোর দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। অন্য ব্যাংক থেকে নিজেদের মধ্যে কেনাকাটায় ও রেমিট্যান্সের ওপরে ভর করে ডলার মজুত করে রাখতে হচ্ছে আমাদের। এখন গণহারে ডলার বিক্রি করলে কদিনের মধ্যে কোষাগার খালি হয়ে যাবে।

এদিকে ডলার মজুতের অভিযোগে সর্বশেষ সোমবার (৮ আগস্ট) ছয়টি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানকে অপসারণের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও সাউথইস্ট ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কেবল ডলার কেনাবেচা করে গত মে মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা করেছে এসব ব্যাংক।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ডলার-সংকট নিরসনে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করা হয়েছে। দামি গাড়ি, প্রসাধনী, স্বর্ণালংকার, তৈরি পোশাক, গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য বৈদ্যুতিক সামগ্রী, পানীয়সহ ২৭ ধরনের পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ব্যাংক ঋণ বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে নতুন ঋণপত্র (এলসি) খোলা কমে গেছে।

তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের তুলনায় গত জুলাই মাসে ঋণপত্র খোলা কমেছে ৩১ শতাংশ। ঈদের কারণে জুলাইয়ে অবশ্য প্রবাসী আয় ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। তাতেও ডলারের দাম না কমে, বরং আরো বেড়েছে। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে জুলাইয়ের ধারায় রয়েছে রেমিট্যান্সের গতি। আগস্টের মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৫৫ কোটি ডলার। বাংলাদেশি টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৫ হাজার ২২৫ কোটি টাকা। সে হিসেবে গড়ে প্রতিদিন দেশে এসেছে প্রবাসীদের পাঠানো ৭ কোটি ৮৬ লাখ ডলার।

অন্যদিকে রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। শিথিল করা হয়েছে অনেক শর্ত। বুধবারও মানি এক্সচেঞ্জ সংক্রান্ত দুটি শর্ত শিথিল করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে।

বাংলাদেশ মানি এক্সচেঞ্জ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. হেলাল উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেছেন, ডলার বিক্রি আর আগের মতো নেই, নগদ ডলারের সংকট রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভিযান শুরুর পর থেকে মানুষের মধ্যে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। এখন চাইলেও যে কেউ এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো থেকে ডলার নিতে পারছেন না। এখন অবশ্যই পাসপোর্ট-ভিসা দেখাতে হবে।

বাজারে ডলারের এমন দুর্দশা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত ছিল ডলারের দর এক জায়গায় আটকে না রাখা। ধীরে ধীরে টাকার অবমূল্যায়ন হতে দিলে এখন এসে একবারে ৩০ শতাংশ অবমূল্যায়নের ধাক্কা সামলাতে হতো না। এখানে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তের অভাব রয়েছে। ডলারের দর আটকে রাখা ব্যাংকের একটি ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করি আমি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, কেউ জানে না ডলারের রেট কোথায় যাবে। ফলে ডলারের রেট কোথায় যাবে সেটা নিয়ে সবাই চিন্তিত। কিছু কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা ডলারের দাম কমানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

তিনি বলেন, সংকটের মূল কারণ হচ্ছে আমাদের রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। ডলারের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এ কারণে আমাদের রপ্তানির বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। রিজার্ভ বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। যদি রিজার্ভটা বাড়াতে পারি তাহলে ডলারের বাজারের বর্তমান যে অবস্থা আছে তা কাটিয়ে ওঠা যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, যারা খোলাবাজারে ডলারের অবৈধ ব্যবসা করছে, আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ পর্যন্ত পাঁচটি মানি চেঞ্জারের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ৪২টিকে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। শোকজের যথাযথ উত্তর দিতে পারলে এসব মানি এক্সচেঞ্জের লাইসেন্সের বিষয়ে বিবেচনা করা হবে। অভিযানে আরো ৯টি প্রতিষ্ঠানকে সিলগালা করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স না নিয়ে এতদিন ব্যবসা করে আসছিল।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

Wordbridge School
Sonali IT Pharmacy Managment System