• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০২২, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

সস্তা প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস পোলট্রি


বিশেষ প্রতিনিধি আগস্ট ৩১, ২০২২, ০১:১০ পিএম
সস্তা প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস পোলট্রি

ঢাকা : বাংলাদেশের আমিষ ও পুষ্টিচাহিদা মেটাতে দিন দিন বেড়ে চলছে পোলট্রি শিল্পের অবদান। মোট প্রাণিজ আমিষের শতকরা ৪০-৪৫ ভাগই জোগান দেয় এই শিল্পটি।

বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন একজন মানুষ ৭ গ্রাম ডিম ও ১৪ গ্রাম মুরগির মাংস খেয়ে থাকে এবং এই খাদ্য থেকে আমিষ আসে যথাক্রমে এক ও তিন গ্রাম অথচ প্রাণিজ আমিষ থাকার কথা কমপক্ষে ১৫ গ্রাম। তাই সুস্থ-সবল দেহ নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে এই অবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।

আশার দিকটি হলো- মানুষের মাঝে এখন স্বাস্থ্য সচেতনতা বেড়েছে। মানুষ এখন লাল মাংসের পরিবর্তে সাদা মাংস খায়। লাল মাংস গরু বা ছাগলের মাংসে ক্যালোরি, চর্বি ও দাম সবই বেশি।

পক্ষান্তরে সাদা বা পোলট্রির মাংসে চর্বি, ক্যালোরি ও দাম অপেক্ষাকৃত বেশ কম। তাই আধুনিক বিশ্বে এখন পোলট্রি সহজলভ্য ও সুলভ আমিষের যোগানদাতা হিসেবে সকল ধর্ম-বয়স ও পেশার মানুষের কাছে অগ্রগণ্য। সঙ্গত কারণেই পুষ্টি সমৃদ্ধিতে পোলট্রির গুরুত্ব বাড়ছে।

আমাদের দেশেও খাদ্য হিসেবে পোলট্রির চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান বাজারে সবচেয়ে সস্তা প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস হিসেবে পোলট্রির ডিম ও মুরগির মাংসের চাহিদা ব্যাপক। এই শিল্পের সাথে যারা জড়িত তাদের উচিত হবে-সবচেয়ে নিরাপদ ও পুষ্টিমাণসমৃদ্ধ পোলট্রির ডিম ও মাংস যত সুলভে দেশের বাজার সৃষ্টি করা। বর্তমান সময়ে গরিবের পুষ্টি বলতে গেলে পোলট্রি।

পোলট্রি শিল্পের বিকাশের ফলে ৬ মাসে, এক বছরে মাংস খেতে না পারা গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী কমবেশি নিয়মিতই পোলট্রির মাংস খেয়ে পুষ্টি চাহিদা কিছুটা হলেও পূরণ করতে পারছে। পোলট্রির মাংস ও ডিম দুটো এখন সহজপ্রাপ্য এবং অপেক্ষাকৃত কম দামে পাওয়া যায়। বিভিন্ন বিশ্লেষণ থেকে দেখা গেছে, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং পুষ্টি চাহিদা পূরণে কৃষির পরপরই সবচেয়ে বড় অবদানকারী শিল্পটির নাম পোলট্রি শিল্প।

লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে- উৎসব আর সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে, স্কুলের টিফিন, রোগীদের পথ্য থেকে শুরু করে মজাদার আধুনিক রেসিপিতে অনন্য স্বাদে ও পুষ্টিতে পোলট্রির মাংস ব্যাপকভাবে সমাদৃত হচ্ছে। খাদ্য হিসেবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নিয়মিত তালিকায় উঠে আসছে ডিম। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রতিদিন একটি করে ডিম খাওয়ার প্রীতি বাড়ছে জনগণের মাঝে।

আশার খবর হচ্ছে, পোলট্রির মাংস বহুমাত্রিক ব্যবহার করে দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে চিকেন নাগেট, চিকেন বল, সসেজ, ড্রামস্টিক, বার্গার, চিকেন সামুচা, মিটবলসহ বিভিন্ন ধরনের মজাদার প্যাকেটজাত খাবার। এসব খাবার নতুন প্রজন্মের রুচি ও চাহিদার সাথে মানানসই এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। কিছুকাল আগেও প্রক্রিয়াজাত এসব খাবার বিদেশ থেকে আমদানি হতো। সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করলে একথা বলা যায় যে-বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে সোশ্যাল প্রোটিন হিসেবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে পোলট্রির মাংস ও ডিম।

- পোলট্রি মুরগিতে ক্যালোরির পরিমাণ গড়ে ১৪০ এবং চর্বির পরিমাণ ১২ গ্রাম।

- ৫০ গ্রাম ওজনের একটি মুরগির ডিমে ৬ দশমিক ৩ গ্রাম আমিষ, প্রায় ৫ দশমিক শূন্য গ্রাম চর্বি, ৭১ দশমিক ৫ কিলো ক্যালোরি শক্তি এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে খনিজ পদার্থ ও ভিটামিন রয়েছে। ডিমের হলুদ অংশে কোলিন নামক একটি পদার্থ থাকে, যা মানুষের মস্তিষ্কের গঠন বৃদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি রক্ষার জন্য অত্যাবশ্যক। তাই শিশুদের প্রতিদিন একটি করে ডিম খাওয়া উচিত।

- বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ বলছে পোলট্রি শিল্পই পারে সবার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনজাত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে। কাজেই এই শিল্পের বিকাশের সম্ভাবনা অনেক।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণে পোলট্রি শিল্প : মেডিকেল সায়েন্স মতে, একজন মানুষের বছরে ন্যূনতম ১০৪টি ডিম খাওয়া উচিত। উন্নত বিশ্বে বছরে জনপ্রতি গড়ে ২২০টি ডিম খাওয়া হয়। জাপানে ডিম খাওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি বার্ষিক জনপ্রতি ৬০০টি। আমাদের দেশে জনপ্রতি ডিম খাওয়ার পরিমাণ বছরে গড়ে ৫০টি। সুস্থ থাকার জন্য একজন মানুষের বছরে কমপক্ষে ১৮-২০ কেজি মুরগির মাংস খাওয়া উচিত।

উন্নত বিশ্বে জনপ্রতি মুরগির মাংস গ্রহণের পরিমাণ ৪০-৪৫ কেজি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ বছরে গড়ে ৫১ দশমিক ১ কেজি মাংস খায় এবং কানাডায় জনপ্রতি বছরে মাংস ভোগের পরিমাণ ৩৬ দশমিক ৫০ কেজি।

অন্যদিকে বাংলাদেশে বছরে জনপ্রতি মাংস ভোগের পরিমাণ মাত্র ৩ দশমিক ৬৩ কেজি।

বর্তমান সরকার ২০২১ সাল নাগাদ জনপ্রতি বার্ষিক ডিম খাওয়ার গড় পরিমাণ ১০৪টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে সরকারের এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে ২০২১ সাল নাগাদ দৈনিক প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ডিম এবং দৈনিক প্রায় ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ হাজার টন মুরগির মাংস উৎপাদনের প্রয়োজন হবে। আর এ লক্ষ্য অর্জন করতে প্রয়োজন প্রায় ৫০-৬০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। বর্তমানে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ছোট বড় পোলট্রি খামারের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। প্রতিদিন ডিম উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ কোটি। মাংস উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ টন।

ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, একটি পোলট্রি ফার্মের ৬৫ শতাংশ খরচ হলো পোলট্রি ফিডে যার মূল উপাদান ভুট্টা। তাহলে ভুট্টার উৎপাদন বৃদ্ধি ও খরচ কমাতে পারলে ডিম ও মাংসের দাম অনায়াসেই নাগালে চলে আসবে।

পোলট্রি শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে লিংকেজ শিল্প, কাঁচামাল ও ওষুধ প্রস্তুতকারক এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। জাতীয় অর্থনীতিতে পোলট্রি শিল্পের অবদান প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ।

গবেষণা তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২১ সাল নাগাদ পোলট্রি শিল্পে বিনিয়োগ ৬০ হাজার কোটি টাকা হলে ছোট-বড় ও মাঝারি আকারের পোলট্রি খামারের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৩ লাখ। এই সেক্টরে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পোলট্রি লিটার থেকে বছরে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।

আমাদের পোলট্রি শিল্প দেশীয় পুঁজি এবং দেশীয় উদ্যোগে তিলে তিলে গড়ে উঠা একটি শিল্প। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এই শিল্প নতুন বিপ্লবের পথ দেখিয়েছে। তবে পোলট্রি শিল্পের বিকাশ ও সফলতার পেছনের গল্পটি কষ্ট, সীমাহীন সাধনা আর অসীম ত্যাগের।

২০০৭, ২০০৯ এবং ২০১১ সালে বার্ড ফ্লুর ভয়াবহ সংক্রমণে এ শিল্পের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রায় ৫০ শতাংশ খামার বন্ধ হওয়ার পরও থেমে থাকেনি এ শিল্পের অগ্রগতি। নিজেদের মানসিক শক্তি আর উদ্যম নিয়ে খামারিরা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। এর পেছনে সরকারের অনেক প্রণোদনা থাকলেও তা যথেষ্ট নয়।

দেশে বছরে গড়ে ১০৪টি ডিম এবং ১৮ থেকে ২০ কেজি মাংস ভোগের চাহিদা পূরণ করতে হলে এই শিল্পের পেছনে সরকারের বড় ধরনের প্রণোদনা প্রয়োজন। আর এই প্রণোদনা সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হলে দেশে ডিম আর মাংসের উৎপাদন দ্বিগুণ হবে। তাহলে সাশ্রয়ী দামে জনগণ ডিম আর মাংস পেলে সবাই তা ভোগ করতে পারবে।

আর তখনই পুষ্টির ঘাটতি কমবে, আমরা পাব স্বাস্থ্যবান প্রজন্ম। কাজেই সরকার, এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং জনগণ সবারই লাভ হবে যদি কাজটি পরিকল্পিতভাবে হয়। আবার ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফালোভী হলে তার ফল ভালো হবে না, বাববার হোঁচট খাবে।

চায়নাদের মতো মানসিকতা নিয়ে আমাদের ব্যবসায়ী মহলকে কাজ করতে হবে আর তা হলো- কম লাভে বিক্রির জন্য পণ্যকে সহজলভ্য করা আর বেশি বিক্রির মাধ্যমে অধিক লাভবান হওয়া। এই ফর্মুলায় চায়নারা বিশ্ববাজার দখল করেছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

Wordbridge School