• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৯ মার্চ, ২০২৪, ১৫ চৈত্র ১৪৩০

যে কারণে দুধ-দইয়ে পাওয়া যাচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক ও কীটনাশক


নিজস্ব প্রতিবেদক ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯, ১১:৫৮ এএম
যে কারণে দুধ-দইয়ে পাওয়া যাচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক ও কীটনাশক

ঢাকা : প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়াই গরুর কাঁচা দুধে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক ও নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের উপাদান পাওয়ার কথা জানিয়েছে ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি (এনএফএসএল)। এর মধ্যে  রয়েছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৮০টির বেশি দেশে নিষিদ্ধ ‘এন্ডোসালফেন’।

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, দেশে এই কীটনাশক অনেক আগেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের রেজিস্টার্ড কীটনাশকের তালিকার ৫৪ নম্বরে এন্ডোসালফেনের কথা উল্লেখ আছে (রেজিস্ট্রেশন নম্বর এপি-১২৭৬)। এই এন্ডোসালফেন কীটনাশক মেশানো লিচু খেয়ে ২০১২ সালে দিনাজপুরে ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল।

এনএফএসএলের গবেষণা বলছে, সব গোখাদ্যে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি রয়েছে। কীটনাশকও মিলেছে কোনও কোনও খাবারে। আর দুধ থেকে তৈরি দইয়ে পাওয়া গেছে সিসা ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু। প্যাকেটজাত গরুর দুধেও অ্যান্টিবায়োটিক ও সিসা পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরুর খাদ্য এবং অসুস্থ হওয়ার পর মাত্রাতিরিক্ত ওষুধের প্রয়োগ এবং পশুচিকিৎসকের পরামর্শ না মানায় এসব উপাদান দুধে চলে আসছে। এতে ভয়ঙ্কর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

২০১২ সালের দিনাজপুরের ১৩ শিশুর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান শেষে আমেরিকান জার্নাল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিনে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়। ওই নিবন্ধে বলা হয়, অতিরিক্ত ও অনুপযুক্ত পদ্ধতিতে কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বিষক্রিয়ায় শিশুদের মস্তিষ্কে জ্বালাপোড়া শুরু হয় (২৪ ঘণ্টার মধ্যে)। আক্রান্ত হয় অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিন্ড্রোমে। এ কারণে মৃত্যু হয় তাদের।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি), বাংলাদেশ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) গবেষকেরা যৌথভাবে ওই নিবন্ধ লেখেন।

আইসিডিডিআর,বি-এর সহযোগী বিজ্ঞানী এবং গবেষক দলের প্রধান সাইফুল ইসলাম সেসময় গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, চাষীরা লিচু গাছে এন্ডোসালফেন কীটনাশক ব্যবহার করেছিলেন। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি থাকে গাছের আশপাশ ও নিচের অংশে। এতে উচ্চমাত্রায় বিষ থাকায় বিশ্বের ৮০টি দেশে এই কীটনাশক নিষিদ্ধ। তবে বাংলাদেশে এখনও এই কীটনাশক সীমিত আকারে ব্যবহার করা হয়। সাইফুল ইসলাম বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। তিনি সেসময়ের প্রতিবেদন  সরবরাহ করেন এবং এর সত্যতা নিশ্চিত করেন। ওই সময় লিচু বাগানে পাওয়া বিভিন্ন কীটনাশকের প্যাকেটের গায়েও এন্ডোসালফেনসহ কয়েকটি কীটনাশকের নাম পাওয়া যায় বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, লিচুগাছে ফুল আসার পর এবং ফল আসার সময় বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সাইপারমেথ্রিন, এন্ডোসালফেন, আলফা-সাইপারমেথ্রিন, লাম্বডা-সাইপারমেথ্রিন। লিচু খেয়ে আক্রান্ত এক শিশুর মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশপাশের বাগানে কীটনাশক ব্যবহারের পর উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়তো। এতে ঘরে থাকাই কঠিন হতো। স্প্রে করার পর কয়েক ঘণ্টা পরও ওই দুর্গন্ধ পাওয়া যেতো।জনস্বাস্থ্য পুষ্টি ইন্সটিটিউটের ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির (এনএফএসএল) প্রধান অধ্যাপক ডা. শাহনীলা ফেরদৌসী বলেন, “ওসিপি গ্রুপের ‘এন্ডোসালফেন’ কীটনাশক সাধারণত ফসলে স্প্রে করা হয়।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অনেক জায়গায় কাঁচা দুধ দিয়ে দই বানানো হয়। এ কারণে অণুজীব থাকে। এই দুধ ভালোভাবে ফুটিয়ে খেতে হবে। আমরা পাস্তুরিত দুধও ফুটিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দিই। আইসিডিডিআর,বি তাদের গবেষণা শেষেও একই কথা বলেছিল। আর কেমিক্যাল নানাভাবে আসতে পারে, মাঠের যে ঘাস সেখান থেকে, কীটনাশক থেকে আসতে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (বালাইনাশক প্রশাসন ও মান নিয়ন্ত্রণ) এ জেড এম ছাব্বির ইবনে জাহান  বলেন, ‘এন্ডোসালফেন এখন আর ব্যবহার হয় না। এটা অনেক আগেই ব্যান (নিষিদ্ধ) করা হয়েছে। ব্যান করার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের যে আন্তর্জাতিক কনভেশন আছে, সেখানে এগুলোকে ক্ষতিকারক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ জন্য এটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে নিবন্ধিত কীটনাশকের তালিকার ৫৪ নম্বরে এন্ডোসালফেনের কথা উল্লেখ করা আছে। এটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর এপি-১২৭৬। প্রোডাক্টের বাণিজ্যিক নাম এন্ড্রসুল ৩৫ ইসি। অন্য নামে এই কীটনাশক দেশের বাজারে আছে কিনা— জানতে চাইলে ছাব্বির ইবনে জাহান এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান। তিনি পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।  উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের পরিচালক চন্ডী দাস কুন্ডুর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কিছুই জানি না।

পশুর শরীরে বা খাবারে অদক্ষভাবে ওষুধ প্রয়োগের ফলে দুধে কেমিক্যাল চলে আসতে পারে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) ডেইরি অ্যান্ড পোল্ট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম হুমায়ূন কবির। তিনি বলেন, ‘গরুর স্বাস্থ্য ভালো হলে অপ্রত্যাশিত কেমিক্যাল পাওয়ার কথা নয়। এগুলো অনেক সময় খামারিরা বা যারা খোলা বাজারে দুধ বিক্রি করে, তারা কিছু কেমিক্যাল ব্যবহার করে। আর গাভী অসুস্থ হলে কিছু মাইক্রো অরগানিজম আসতে পারে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।’ তিনি বলেন, ‘গরুর দুধে কীটনাশক, সিসা পাওয়া যায়। এটা আমরাও কাজ করতে গিয়ে দেখেছি।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, গাভী অসুস্থ হলে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অনেকে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করেন। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের গাইডলাইন আছে। অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের পর এক সপ্তাহ গাভী থেকে দুধ নেওয়া যাবে না। এ নিয়ম মানা না হলে অ্যান্টিবায়োটিক দুধের মধ্যে চলে আসতে পারে। আর এই অ্যান্টিবায়োটিক তাপেও খুব একটা যায় না। দুধ সেদ্ধ করার পরও থেকে যায়।

অধ্যাপক ড. এ কে এম হুমায়ূন কবির বলেন, দুধের মধ্যে ভারী ধাতব যেমন সিসা, ক্রোমিয়াম আসে পশুর খাবারের মাধ্যমে। বিভিন্ন ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল এলাকার ঘাস খেলে সিসার পরিমাণ বেড়ে যায়।

ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির (এনএফএসএল) গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, গোখাদ্যের ৩০টি নমুনা পরীক্ষা করে দুটির মধ্যে এন্ডোসালফেন, ১৬টি নমুনায় ক্রোমিয়াম, ২২টিতে টেট্রাসাইক্লিন, ২৬টিতে এনরোফ্লোক্সাসিন, ৩০টিতেই সিপ্রোসিন এবং চারটিতে আফলাটক্সিন গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। গাভীর দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯ শতাংশ দুধে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কীটনাশক, ১৩ শতাংশে টেট্রাসাইক্লিন, ১৫ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় সিসা পাওয়া গেছে। আর ৯৬ শতাংশ দুধে মিলেছে বিভিন্ন অণুজীব।

প্যাকেটজাত দুধের ৩১টি নমুনার মধ্যে ৩০ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি হারে আছে টেট্রাসাইক্লিন। একটি নমুনায় সিসা মিলেছে। একইসঙ্গে ৬৬ থেকে ৮০ শতাংশ দুধের নমুনায় বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে।

দইয়ের ৩৩টি নমুনা পরীক্ষা করে একটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি সিসা পাওয়া গেছে। আর ৫১ শতাংশ নমুনায় মিলেছে বিভিন্ন অণুজীব।

এনএফএসএল প্রধান অধ্যাপক ডা. শাহনীলা ফেরদৌসী বলেন, ‘অণুজীব দ্বারা আক্রান্ত খাবার খেলে ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ নানা রোগ হতে পারে। আর কেমিক্যাল মিশ্রিত দুধের ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি। এ ব্যাপারে আমাদের এখনই সতর্ক হতে হবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

Wordbridge School
Link copied!