স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও উন্নয়নের ছোয়া লাগেনি ময়মনসিংহের রেল বিভাগে। এখনও চলছে ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া অবকাঠামোর উপর নির্ভর করে। পুরাতন রেললাইন, বগি, ইঞ্জিনের কারনে প্রায় ঘটছে ট্রেন লাইনচ্যুত ও ইঞ্জিন বিকল হওয়ার মত ঘটনা। এতে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ট্রেন ভ্রমণ থেকে। ঈদ যাত্রায় এই দুর্ভোগ বেড়ে যায় কয়েকগুন।
সড়কে যানজট এড়াতে এবং অল্প খরচ ও নিরাপদ যাতায়াতে যাত্রীরা বেছে নেন ট্রেন ভ্রমণকে। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ, জামালপুর ও নেত্রকোনায় রেল যোগাযোগ সহজ হওয়ায় ঈদ যাত্রায় রেকর্ড সংখ্যাক যাত্রী আসা যাওয়া করে অঞ্চলে। ট্রেন ভ্রমণে যাত্রীদের আগ্রহ বাড়লেও ময়মনসিংহে রেল বিভাগে বাড়েনি যাত্রী সেবার মান। ব্রিটিশ আমলের অবকাঠামো দিয়েই চলছে রেল।
পুরাতন রেল লাইন, বগি, ইঞ্জিন দিয়ে চলছে ট্রেন। স্টেশনগুলোতে নেই যাত্রীদের বসার পর্যাপ্ত জায়গা। রয়েছে বিশুদ্ধ পানি, টয়লেটের অভাব। দিনে রাতে নিরাপত্তাহীনতা, টিকিট কালোবাজারি, সব রুটে ট্রেন না থাকায় আগ্রহ কমছে যাত্রীদের।
ময়মনসিংহ-ঢাকা রেল রুটে ফাতেমানগর, আওলিয়া নগর, ধলা সহ রয়েছে বেশ কয়েকটি শতবর্ষ পুরোনো রেলওয়ে স্টেশন। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ ভবনেই চলছে এসব স্টেশনের কার্যক্রম।
শুধু তাই নয়, খোলা আকাশের নিচে নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রাংশ। রাতে চলাচলকারীদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠে স্টেশনগুলো। আর অধিকাংশ ট্রেনের স্টপেজ না থাকায় বিপাকে পড়ছেন বিভিন্ন উপজেলার কৃষক, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশাজীবির মানুষ।
নেত্রকোনা যাত্রী আহাদ শেখ জানান, একটি ভবন আর প্লাটফর্ম উচু করা ছাড়া আর কোন দৃশ্যমান উন্নয়ন নেই এই স্টেশনে। ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থাকতে হয়। একটু বসে যে বিশ্রাম নিব তার উপায় নেই। প্লাটফর্মের জায়গা দখল করে দোকানপাট বসেছে। এতে সংকুচিত হয়ে গেছে জায়গা।
জামালপুরগামী তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনের জন্য অপেক্ষায় থাকা যাত্রী বিলকিস খাতুন জানান, স্টেশনে নেই পানি আর টয়লেটের ব্যবস্থা। আমরা নারীরা বেশি দুর্ভোগে পড়ি। সরকারের উচিত নারীদের জন্য স্টেশন গুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা।
আরেক যাত্রী হুমায়ুন কবীর জানান, ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল করতে গেলে দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। প্রায় এই রুটে বগি, ইঞ্জিন লাইন চ্যুত হয়ে পড়ে। অনেক সময় ইঞ্জিনে আগুন লেগে যাওয়ারও ঘটনা ঘটেছে। এতে আমরা আতঙ্কিত থাকি কখন বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যায়। ইঞ্জিন সংকটের কারনের বন্ধ হয়ে গেছে অনেক ট্রেন। ট্রেন বাড়ানোর বদলে ট্রেনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় দুর্ভোগ আরো বাড়ছে। সরকারের প্রয়োজন ময়মনসিংহ থেকে বিভিন্ন জেলায় যাতায়াতের জন্য রেল যোগাযোগ স্থাপন করা। আর পুরাতন লাইনটি সংস্কার করে নতুন ডাবল লাইন দেওয়া।
রিফাত শিকদার নামে আরেক যাত্রী জানান, টিকিট অনলাইনে পাওয়া গেলেও ওয়েবসাইটে ঢুকলেই দেখা যায় প্রায় সব টিকিট শেষ হয়ে গিয়েছে। আমরা টিকিট পাই না। স্টেশনের অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীর সহযোগিতায় একটি চক্র আগেই টিকিট কেটে পরে তা কালোবাজারির মাধ্যমে বেশি দামে বিক্রি করে। কমিউটার ট্রেন গুলোতে দেখা যায় প্রয়োজন না থাকলেও তিন চারটি টিকিট কাটতে হয় একটি আসন পাওয়ার জন্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ময়মনসিংহের স্টেশন গুলো দিন রাত সবসময় অনিরাপদ থাকে। সন্ধ্যা হলেই এই জায়গা হয়ে উঠে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য। রাতে পর্যাপ্ত আলো না থাকায় প্রায় ঘটে চুরি ছিনতাইয়ের ঘটনা। পরিত্যাক্ত বগিতে চলে অসামাজিক কর্মকান্ড ও নেশার আস্তানা।
ময়মনসিংহ রেলওয়ে থানার ওসি মোহাম্মদ আকতার হোসেন জানান, এবারের ঈদ যাত্রায় স্টেশন ও ট্রেনের ভিতরে নিরাপত্তায় থাকবে পুলিশ। প্লাটফর্ম গুলোতে থাকবে সাদা পোশাকে পুলিশ। রেল স্টেশন এলাকায় চুরি ছিনতাই দমনে তৎপর রয়েছে পুলিশ। টিকিট কালোবাজারির সাথে যারা জড়িত থাকছে তাদেরকে আটক করে নেওয়া হচ্ছে আইনি ব্যবস্থা।
ময়মনসিংহ রেলওয়ে জংশনের স্টেশন সুপারিনটেনডেন্ট, আব্দুল্লাহ আল হারুন জানান, ময়মনসিংহের রেল লাইন গুলো অনেক পুরাতন। বিভিন্ন সময় রেল লাইন ভেঙ্গে যায়। এর ফলে ট্রেন লাইন চ্যুত হবার ঘটনাও ঘটে। তবে এবার ঈদ যাত্রায় যাত্রীদের কোন ধরনের দুর্ভোগ না হয় তারজন্য সকল প্রস্তুতি নিয়েছে রেল বিভাগ। ময়মনসিংহ রেল স্টেশনের উন্নয়নের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
ময়মনসিংহ রুটে চলাচল করে ২৭ জোড়া ট্রেন। রেল সেবা উন্নয়নে পদক্ষেপ নিবে কর্তৃপক্ষ, এমনটাই প্রত্যাশা ময়মনসিংহবাসীর।
এম
আপনার মতামত লিখুন :