ছবি: প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের রাউজানে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় পাঁচ অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করার দাবি করেছে পুলিশ। তবে রোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা করা হয়নি এবং মূল অভিযুক্তদের কাউকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের পরিবারের কেউ আজ সোমবার সকাল পর্যন্ত থানায় মামলা করতে আসেননি। তবে ঘটনার পর সন্দেহভাজন হিসেবে মুহাম্মদ জাকির (৪২) নামের একজনকে আটক করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা না হওয়ায় তাঁকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল রোববার আদালতে পাঠানো হয়েছে।
গত শনিবার দুপুরে রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে পাঁচজন অস্ত্রধারীকে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে তিনজনের হাতে পিস্তল এবং দুজনের হাতে শটগান ছিল। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে যাদের শনাক্ত করা হয়েছে, তারা হলেন-কদলপুর এলাকার মোহাম্মদ ইলিয়াস ওরফে দামা ইলিয়াস, দিদারুল আলম ওরফে দিদার, রাউজান পৌরসভার ফরেস্ট অফিস এলাকার মোহাম্মদ ইউসুফ, পূর্ব রাউজানের মোহাম্মদ জাহেদ এবং মোহাম্মদ আবছার।
সূত্রগুলোর দাবি, প্রথমে ইলিয়াস ও দিদার মাকসুদুলকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। পরে ইউসুফ, জাহেদ ও আবছার এগিয়ে গিয়ে আরও কয়েক দফা গুলি করে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেন। তবে রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, তদন্তের স্বার্থে সন্দেহভাজনদের পরিচয় এই মুহূর্তে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী চক্র ‘রায়হান গ্রুপ’-এর সদস্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রুপটির সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে এবং তাদের অনেকেই বিএনপির কর্মী-সমর্থক হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রায়হানকে স্থানীয়ভাবে সংসদ সদস্য গিয়াস কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে গণ্য করা হয়।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি হাসান মোহাম্মদ জসিম বলেন, “সন্ত্রাসীদের কোনো দল নেই। রাজনৈতিক পরিচয়ে অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হলে তার পরিণতি ভালো হয় না। খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।”
রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াস কাদের চৌধুরী বলেন, “অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়।”
পুলিশ সূত্র জানায়, আলোচনায় থাকা রায়হানের বিরুদ্ধে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও নগরের বিভিন্ন থানায় ১২টি হত্যাসহ মোট ২৪টি মামলা রয়েছে। তাঁর সহযোগী দামা ইলিয়াসের বিরুদ্ধে পাঁচটি হত্যাসহ ১৮টি মামলা এবং মোহাম্মদ ইউসুফের বিরুদ্ধে দুটি হত্যাসহ চারটি মামলা রয়েছে। এছাড়া দিদার, জাহেদ ও আবছারের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পেছনে কর্ণফুলী নদী থেকে বালু উত্তোলন ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিরোধের বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক আলোচনায় রয়েছে। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, রাঙ্গুনিয়ার চম্পাতলী ঘাট এবং রাউজানের খেলার ঘাট এলাকার বালুমহালের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন মাকসুদুল হক। ফলে এই আর্থিক ও কৌশলগত বিরোধই হত্যার প্রধান কারণ হতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাউজানের পূর্বাঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পাহাড়তলী, কদলপুর, রাউজান সদর ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড ও গোলাগুলির ঘটনায় এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। মাকসুদুলকে হত্যার পর হামলাকারীরাও পাহাড়ের দিকেই পালিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিহতের বড় ভাই ও বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান পেয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন বলেন, “আমার ভাইয়ের কোনো ব্যক্তিগত শত্রু ছিল না। সিসিটিভিতে যাদের দেখা গেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হলে হত্যার রহস্যও উন্মোচিত হবে। হত্যার ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পরও মামলা বা কেউ গ্রেপ্তার না হওয়া দুঃখজনক। আমরা খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
গতকাল রোববার বিকেলে চম্পাতলী ঈদগাহ মাঠে মাকসুদুল হকের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ঢল নামে।
স্থানীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজানে অন্তত ২১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অধিকাংশ ঘটনার রহস্য এখনো পুরোপুরি উদঘাটন হয়নি। একের পর এক হত্যা, সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উপজেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এসএইচ
আপনার মতামত লিখুন :