ছবি : প্রতিনিধি
রাজশাহী: রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠের জনসভায় ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষিদের ১২ কোটি টাকা প্রনোদনা প্রদান করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজশাহীর জনসভা থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির পেছনে পলাতক স্বৈরাচারের অর্থায়ন রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়নে জনগণের সমর্থনও চেয়েছেন সরকারপ্রধান।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তারেক রহমান। জনসভায় রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি কৃষকদের জন্য প্রণোদনা বিতরণও ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বক্তব্যের শুরুতেই মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই আন্দোলনের চেতনা ধারণের প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিএনপি একাত্তরকে ধারণ করে, চব্বিশকেও ধারণ করে। জুলাই আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, শহীদ পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ এবং আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তারেক রহমানের অভিযোগ, জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে যেসব রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তাদের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। এ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যারা একাত্তরে জনগণকে ধোঁকা দিয়েছিল, তারাই চব্বিশের জুলাই আন্দোলনেও একই কাজ করেছে। মুখের কথার সঙ্গে তাদের কর্মকাণ্ডের মিল নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগ করে তিনি বলেন, দেশের শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির চেষ্টার পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে। তাঁর দাবি, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারী শক্তি সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করছে। সেই অর্থ ব্যবহার করে দেশের ভেতরে একটি পক্ষ অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।
তারেক রহমান বলেন, দেশের কয়েকটি স্থানে কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জনসভায় সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষি খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে রাজনৈতিক বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন এবং কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড চালুর বিষয়ে জনগণের সমর্থন প্রত্যাশা করেন তিনি।
নির্বাচনের আগে এসব কর্মসূচি নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ফ্যামিলি কার্ড বন্ধ হলে দেশের মা-বোনেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হলে আগামী পাঁচ বছর বিএনপির পাশে থাকার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে একাত্তর থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান সরকারপ্রধান।
রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি জনসভায় কৃষকদের জন্য প্রণোদনা বিতরণ কর্মসূচি ছিল উল্লেখযোগ্য আয়োজন। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির জন্য ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা বিতরণ করেন।
মঞ্চে বসে ল্যাপটপের বোতাম চেপে প্রণোদনার অর্থ ছাড় করেন তিনি। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, কৃষকদের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি এ অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়। পরে দেশের ১৫টি সুগার মিল জোনের ১৫ জন কৃষকের হাতে প্রণোদনার প্রতীকী চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
কৃষি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই কর্মসূচিকে সামনে রেখে আখচাষিদের আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও জনসভার আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের পরিচালনায় বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ, অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল ও শফিকুল হক মিলন। এ ছাড়া বক্তব্য দেন ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিএনপির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক ও সংসদ সদস্য আবুল কালাম, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবীবা এবং কৃষকদলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
রাজশাহীর এই জনসভায় মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই আন্দোলনের চেতনা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভূমিকা, শিল্পাঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি—সব মিলিয়ে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার বার্তা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পিএস