ফাইল ছবি
আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে প্রথমবারের মতো সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। আগামী বছরের জানুয়ারিতে এ বন্ড ইস্যুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫০ কোটি থেকে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের বন্ড ছাড়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সেবা ক্রয়ের শর্তাবলি পর্যালোচনা, ফি নির্ধারণ এবং দর-কষাকষির জন্য ছয় সদস্যের একটি বিশেষ নেগোসিয়েশন কমিটি গঠন করেছে অর্থ বিভাগ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ থেকে গতকাল মঙ্গলবার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (টিডিএম ও সামষ্টিক) কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এরই মধ্যে বন্ড ইস্যুর ব্যবস্থাপক হিসেবে দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।
কমিটির প্রধান কাজ হবে লিড ইস্যু ম্যানেজার, জয়েন্ট বুকরানার্স, গ্লোবাল কো-অর্ডিনেটর, সার্বভৌম রেটিং উপদেষ্টা, লিগ্যাল কাউন্সিল ও কৌশলগত পরামর্শকসহ বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত শর্তাবলি পর্যালোচনা এবং দর-কষাকষি করা। পাশাপাশি ব্যাংক ফি, পরামর্শক ফি, তৃতীয় পক্ষের ব্যয় ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ যাচাই করে যৌক্তিক ফি এবং ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের সুপারিশ করবে কমিটি।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কমিটিতে অর্থ বিভাগের সরকারি ঋণ ও আর্থিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের যুগ্মসচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত বা যুগ্মসচিব পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নির্বাহী পরিচালক পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধি সদস্য হিসেবে থাকবেন। অর্থ বিভাগের সরকারি ঋণ নীতি ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনা অধিশাখার যুগ্মসচিব সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।
এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাসম্পন্ন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট বন্ড ইস্যুর সার্বিক বিষয় তদারকি করবেন। প্রয়োজনে কমিটি তাঁর পরামর্শ নেবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ও বিএসইসি চেয়ারম্যানকে কমিটির জন্য উপযুক্ত প্রতিনিধি মনোনয়নের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কমিটির কার্যপরিধিতে আন্তর্জাতিক তুলনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য উন্নয়নশীল ও সমতুল্য দেশের সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ফি ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে সেবার পরিধি, কাজ শেষ করার সময়সীমা, ফি পরিশোধের শর্ত, আইনি দায় ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো পর্যালোচনা করবে কমিটি। সিন্ডিকেট ব্যাংক নির্বাচন ও বন্ড বরাদ্দের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়ানোর বিষয়টিও তাদের বিবেচনায় থাকবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ, সার্বভৌম বন্ড ইস্যু এবং পুঁজিবাজার সংস্কারের লক্ষ্যে হংকংভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্রিজউড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে নিয়োগ দিতে যাচ্ছে সরকার। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে সাত লাখ মার্কিন ডলার পরামর্শক ফি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় আট কোটি ৬৮ লাখ টাকা, প্রতি ডলার ১২৪ টাকা হিসাবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে সিঙ্গেল সোর্স সিলেকশন (এসএসএস) পদ্ধতি অনুসরণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে অর্থ বিভাগ ও ব্রিজউড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মধ্যে একটি খসড়া চুক্তিও প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে সরাসরি একটি প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেওয়ার যৌক্তিকতা এবং বিপুল অঙ্কের পরামর্শক ফি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ লক্ষ্যে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি পুঁজিবাজার সংস্কার, সার্বভৌম বন্ড ইস্যু, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করছে। নতুন নেগোসিয়েশন কমিটির দায়িত্বের মধ্যে বিভিন্ন সেবার মূল্য ও শর্ত যাচাইয়ের বিষয়টি থাকায় পরামর্শক নিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় নির্ধারণেও এ প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারের এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো অর্থায়নের উৎস বহুমুখী করা এবং আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করা। এত দিন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে বাংলাদেশ প্রধানত বহুপাক্ষিক ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের ওপর নির্ভর করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে নিজস্ব বন্ড ইস্যু করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ঋণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তৈরির সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বন্ডের মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। এ ধরনের বন্ড ইস্যুর আগে ক্রেডিট রেটিং প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া ঋণের তুলনায় সুদের হার বেশি হতে পারে এবং বিদেশি মুদ্রায় ঋণ পরিশোধের চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে বন্ড ইস্যুর সামগ্রিক ব্যয়, পরামর্শক ফি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন কমিটি এসব সেবার ফি ও আনুষঙ্গিক ব্যয় পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সুপারিশ দেবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
এসএইচ