ফাইল ছবি
ঢাকা: খেলাপি বিনিয়োগ, বিপুল প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকটে চাপে রয়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় প্রভিশন পুরোপুরি সংরক্ষণ করলে ৮৬ কোটি ৫১ লাখ টাকার মুনাফার বদলে ৫ হাজার ৩০৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা লোকসান হতো।
ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত বিনিয়োগ এক বছরে প্রায় ১ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা বেড়ে ৮ হাজার ৮৫২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। মোট বিনিয়োগের বিপরীতে খেলাপি বিনিয়োগের হারও ২০২৪ সালের ১৫ দশমিক ১৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১৭ দশমিক ১৬ শতাংশ হয়েছে।
প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যাংকটির ঘাটতি ভয়াবহ। বিনিয়োগ ও দায়বহির্ভূত প্রতিশ্রুতির বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ৬ হাজার ৯৮৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা হলেও সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৯৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। অন্যান্য খাতের ঘাটতিসহ মোট প্রভিশন ঘাটতি ৫ হাজার ৩৯৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক এই ঘাটতি পরবর্তী সময়ে সংরক্ষণের সুযোগ দেওয়ায় ব্যাংকটি ২০২৫ সালের হিসাবে পুরো প্রভিশন ব্যয় দেখায়নি। নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পূর্ণ প্রভিশন সংরক্ষণ করলে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী ৮৬ কোটি ৫১ লাখ টাকার মুনাফার বদলে ৫ হাজার ৩০৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা লোকসান হতো।
মুনাফার হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষক। তাঁদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিশোধ না হওয়া সত্ত্বেও ২০ কোটি টাকা মুনাফা হিসেবে দেখিয়েছে ব্যাংকটি। পাশাপাশি আয়করের বিপরীতে ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকার প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখা হয়নি। এতে ব্যাংকটির প্রকাশিত মুনাফা ৪১ কোটি ৪০ লাখ টাকা বেশি হয়েছে বলে নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ।
ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততার হারও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সীমার নিচে। ২০২৫ সালের শেষে এ হার ছিল ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ, যেখানে প্রয়োজন ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ। এতে মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৮৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। নিরীক্ষকের হিসাবে, পুরো প্রভিশন ঘাটতির প্রভাব যুক্ত হলে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক হয়ে যেতে পারে।
আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রেও চাপ বেড়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির তহবিল ব্যয়ের হার ৯ দশমিক ৮০ শতাংশে উঠেছে, আগের বছর যা ছিল ৯ দশমিক ১২ শতাংশ। পরিচালন আয় ও ব্যয়ের অনুপাতও ৫৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৭ দশমিক ০৩ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে নিট বিনিয়োগ আয় কমেছে ৫১ দশমিক ৩১ শতাংশ।
পুনঃতফসিল করা বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা, যা মোট বিনিয়োগের ১৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। বছরজুড়ে এসব বিনিয়োগ থেকে আদায় হয়েছে ৩৯০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। নিরীক্ষকের মতে, পুনঃতফসিল ও দীর্ঘ grace period-এর কারণে নগদ অর্থ আদায় পিছিয়ে যাচ্ছে, যা ব্যাংকের তারল্যের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়ও অনিয়মের ঘটনা ধরা পড়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির দুটি শাখায় নগদ অর্থ আত্মসাৎ এবং বিনিয়োগ বিতরণসংক্রান্ত জালিয়াতি ও অনিয়ম শনাক্ত হয়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অর্থ আদায় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে এসব ঘটনা নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
এ অবস্থায় ২০২৫ সালের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি ব্যাংকটি। বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রক বিধিনিষেধ ও বিতরণযোগ্য তহবিলের ঘাটতির কারণে লভ্যাংশ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এএইচ/পিএস