পে স্কেল-দ্রুত বদলি, জাতীয়করণসহ শিক্ষক-কর্মচারীদের ৮ দাবি 

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম
পে স্কেল-দ্রুত বদলি, জাতীয়করণসহ শিক্ষক-কর্মচারীদের ৮ দাবি 

ফাইল ছবি

চাকরি জাতীয়করণ, দ্রুত নবম জাতীয় বেতন স্কেল প্রদান এবং নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তকরণসহ আট দফা দাবি জানিয়েছে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট। এসব দাবি বাস্তবায়নে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে সংগঠনটি।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব দাবি জানান সংগঠনের সভাপতি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান মো. সেলিম ভূঁইয়া এমপি।

সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-

১. শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ

দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণের দাবি জানিয়েছে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষার দায়িত্ব পালন করছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা, আর্থিক নিশ্চয়তা ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

সংগঠনটির দাবি, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের ভাগ্যের পরিবর্তনে চাকরি জাতীয়করণের কোনো বিকল্প নেই।

এ বিষয়ে জাতীয়করণের একটি সম্ভাব্য আর্থিক হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, বেতন-ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, বাড়িভাড়া, দুটি উৎসব ভাতা ও বৈশাখী ভাতাসহ জাতীয়করণে বছরে মোট ব্যয় হতে পারে প্রায় ২৬ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের বেতন, সেশন চার্জ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পদ থেকে আয়, সঞ্চিত অর্থের সুদ এবং রিজার্ভ ফান্ড থেকে বছরে প্রায় ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা দেখিয়েছে সংগঠনটি। তাদের উপস্থাপিত হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যমান সরকারি ব্যয় ও সম্ভাব্য আয় সমন্বয় করে জাতীয়করণে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা।

সংগঠনটি মনে করে, এই পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যয়ের মাধ্যমে দেশের শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ করে শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

২. দ্রুত নবম জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়ন

শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য দ্রুত নবম জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী বেতন প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ১৯৮০ সালে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শিক্ষক-কর্মচারীদের ৫০ শতাংশ বেতন প্রদানের মাধ্যমে জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে বেতন স্কেল পরিবর্তন হলেও সব পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী সমানভাবে সুবিধা পাননি বলে দাবি সংগঠনটির।

সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের কাছে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন প্রদানে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৬৭৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়। অবিলম্বে নবম জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

৩. নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তকরণ
শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষক সমাজের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দ্রুত এমপিওভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, শিক্ষকরাই জাতি গঠনের মেরুদণ্ড। অথচ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করছেন। এতে তাঁরা আর্থিক ও সামাজিকভাবে নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।

সংগঠনটির মতে, শিক্ষক সমাজকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে না পারলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই অবিলম্বে অন্তর্ভুক্ত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্ত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।

৪. বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকদের দ্রুত বদলির ব্যবস্থা
শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের বদলি সমস্যার সমাধানে দ্রুত বদলির কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বর্তমানে হাজার হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা নিজ উপজেলা, জেলা কিংবা বিভাগের বাইরে চাকরি করার সুযোগ না পেয়ে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে শিক্ষকতা করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে তাঁরা পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

সংগঠনটির দাবি, শিক্ষকতা পেশায় মনোযোগ ধরে রাখতে এবং পারিবারিক জীবন স্বাভাবিক রাখতে বদলি ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।

বক্তব্যে আরও বলা হয়, শিক্ষকদের বদলির জন্য সফটওয়্যার চালু করা হলেও সেখানে ত্রুটি রয়েছে। সফটওয়্যারের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ করা হলেও কোনো অজ্ঞাত কারণে আবেদনকারীদের বদলির আদেশ দেওয়া হচ্ছে না। তাই সফটওয়্যারের ত্রুটি দূর করে বদলির আবেদন নিষ্পত্তি এবং দ্রুত বদলির আদেশ প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে।

৫. শতভাগ উৎসব ভাতা প্রদান
বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা পান। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে এই অর্থ দিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে যথাযথভাবে ঈদ উদযাপন করা কঠিন বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, উৎসব সবার জন্য আনন্দের হলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষক-কর্মচারীদের অনেকেই সেই আনন্দ যথাযথভাবে উপভোগ করতে পারেন না।

প্রতিটি শিক্ষক পরিবার যাতে আনন্দঘন পরিবেশে ঈদ উদযাপন করতে পারে, সে জন্য এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের শতভাগ উৎসব ভাতা প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে।

৬. সরকারি নিয়মে বাড়িভাড়া প্রদান
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বর্তমানে মূল বেতনের ১৫ শতাংশ বাড়িভাড়া দেওয়া হচ্ছে। সংগঠনটির মতে, বর্তমান বাজারদরে এই সামান্য অর্থ দিয়ে বসবাসের উপযোগী বাড়ি ভাড়া পাওয়া প্রায় অসম্ভব। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বাড়িভাড়ার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীরা আর্থিক সংকটে পড়ছেন। বিশেষ করে কর্মস্থলে বসবাসের জন্য বাড়িভাড়া দিতে গিয়ে তাঁদের বেতনের বড় একটি অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।

তাই সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বাড়িভাড়া প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে।

৭. শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরির বয়সসীমা ৬৫ বছর করা
শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৬৫ বছর করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাকরির অবসরের বয়সসীমাও বাড়ানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে চাকরির বয়সসীমা ৬৫ বছর করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

সংগঠনটির মতে, অভিজ্ঞ শিক্ষকরা দীর্ঘদিনের কর্মজীবনে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা দিয়ে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তাই তাঁদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ বছর নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

৮. ১ম থেকে ১২তম এনটিআরসিএ সনদধারীদের নিয়োগ
১ম থেকে ১২তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সনদধারীদের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নিয়োগ প্রদানের দাবি জানিয়েছে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সনদধারী বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছেন। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার সবার অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর বলে সংগঠনটি আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী এসব সনদধারীর নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছিলেন উল্লেখ করে সংগঠনটি বলেছে, ১ম থেকে ১২তম এনটিআরসিএ সনদধারীদের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নিয়োগ প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

এসএইচ 
 

Link copied!