ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা: রেকর্ড পরিমাণ গরম থেকে বাঁচতে শীতল হওয়ার চেষ্টায় ফ্রান্সজুড়ে গত কয়েক দিনে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান লিকরনু মঙ্গলবার (২৩ জুন) এই মর্মান্তিক তথ্য নিশ্চিত করেছেন। দাবদাহে যখন পুরো ইউরোপ স্থবির, ঠিক তখনই ফ্রান্সে তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে।
দেশটির আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার ফ্রান্সের ইতিহাসে উষ্ণতম দিন রেকর্ড করা হয়েছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি শহরে তাপমাত্রা ৪৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। অসহনীয় এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির ৫৪টি বিভাগে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে, যা বুধবার (২৪ জুন) আরও বেড়ে ৫৮টিতে দাঁড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চরম এই তাপপ্রবাহে দিশেহারা সাধারণ মানুষ প্রশান্তির খোঁজে খাল, নদী ও জলাশয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তবে এই প্রবণতাকে বিপজ্জনক বলে সতর্ক করেছেন দেশটির ক্রীড়ামন্ত্রী মারিনা ফেরারি। তিনি বলেন, গরম থেকে বাঁচতে মানুষের ব্যাকুলতা আমি বুঝি, কিন্তু অনুমোদনহীন বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সাঁতার কাটা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।
এদিকে, চরম এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি বৈঠক ডেকেছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান লিকরনু। গত ১৮ জুন থেকে এ পর্যন্ত ৪০ জনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি একে ‘দুঃখজনক অভিশাপ’ বলে অভিহিত করেছেন। নিহতদের অধিকাংশই তরুণ। সোমবার দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের কার্পেনত্রাস এলাকায় নিজের গাড়ির ভেতর অচেতন অবস্থায় পাওয়া ২ ও ৪ বছর বয়সী দুই শিশুকে বাঁচানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হন জরুরি উদ্ধারকর্মীরা।
বিজ্ঞানীদের মতে, ‘ওমেগা ব্লক’ নামক একটি বিশেষ আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে এই দাবদাহ তৈরি হয়েছে। গ্রিক বর্ণ ‘ওহম’-এর আকৃতির এই বায়ুমণ্ডলীয় বিন্যাস উষ্ণ বাতাসকে আটকে রাখছে, ফলে দিনের পর দিন তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই ধরনের দাবদাহ ও ঘূর্ণিঝড় আরও তীব্র ও ঘনঘন হওয়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ইউরোপ দ্বিগুণ হারে উষ্ণ হচ্ছে।
চলমান এই পরিস্থিতির সাথে ২০০৩ সালের ভয়াবহ অগাস্টের দাবদাহের তুলনা করছেন আবহাওয়াবিদরা। সে সময় ১৬ দিন স্থায়ী সেই গরমে ইউরোপজুড়ে আনুমানিক ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বর্তমান দাবদাহ কতদিন স্থায়ী হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ফ্রান্সের তাপমাত্রা এমনই চড়া থাকবে। শুক্রবার থেকে আটলান্টিক উপকূল দিয়ে পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে।
দাবদাহের এই আঁচ লেগেছে ইতালি, ব্রিটেন, সুইজারল্যান্ড ও স্পেনেও। ইতালির ১৫টি শহরে সর্বোচ্চ সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। ব্রিটেনের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যার প্রভাবে বহু স্কুল আগেভাগেই ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। স্পেনের উত্তরাঞ্চলে দাবানলের আশঙ্কায় ঐতিহ্যবাহী বোনফায়ার বা অগ্নিকুণ্ড জ্বালানোর উৎসব বাতিল করা হয়েছে। মাদ্রিদে গৃহহীন ও অসহায় মানুষের জন্য খোলা হয়েছে ‘ক্লাইমেট শেল্টার’ বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আশ্রয়কেন্দ্র।
এদিকে, তীব্র গরমে ইউরোপের পরিবহন ব্যবস্থায় ধস নেমেছে। অনেক জায়গায় ট্রেন চলাচল বাতিল বা ধীরগতিতে চলছে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ারসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়েছে। দোকানপাটে ফ্যান ও এসির জন্য মানুষের ভিড় বাড়ছে। চাহিদা এতই বেশি যে, মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যেই অনেক দোকানের মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গরম থেকে বাঁচতে অনেক পর্যটক তাদের ভ্রমণের পরিকল্পনা পরিবর্তন করছেন। ক্রোয়েশিয়ার মতো গরম এলাকা বাদ দিয়ে সুইডেনের মতো শীতল দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন তারা। বলাই বাহুল্য, এই অসহনীয় দাবদাহ শুধু জনজীবনকেই ব্যাহত করছে না, বরং তা কৃষি উৎপাদন ও অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলছে।
সূত্র: এনডিটিভি
এসআই
আপনার মতামত লিখুন :