খাদ্যতালিকা থেকে চিনি পুরোপুরি বাদ দিলে শরীরে কী ঘটে? গবেষণায় চমক

  • লাইফস্টাইল ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জুন ২৭, ২০২৬, ১২:৩৪ পিএম
খাদ্যতালিকা থেকে চিনি পুরোপুরি বাদ দিলে শরীরে কী ঘটে? গবেষণায় চমক

ওজন কমানো কিংবা সুস্থ থাকার তাগিদে অনেকেই এখন ডায়েট থেকে চিনিকে একেবারে 'তিলপাপড়ি'র মতো বিদায় করছেন। স্বাস্থ্য সচেতনদের মাঝে চিনি বর্জনের এই ট্রেন্ড যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই সম্পূর্ণ উল্টো এবং চাঞ্চল্যকর এক বৈজ্ঞানিক তথ্য সামনে এলো। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, খাদ্যতালিকা থেকে চিনি বা সুক্রোজ সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া সবসময় শরীরের জন্য উপকারী নাও হতে পারে; বরং কিছু ক্ষেত্রে এটি বিপাকীয় (মেটাবলিক) স্বাস্থ্যের ওপর উল্টো মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অনুষ্ঠিত ‘এন্ডো ২০২৬’ আন্তর্জাতিক মেডিকেল সম্মেলনে উপস্থাপিত এক গবেষণাপত্রে এই নতুন বিপত্তির কথা জানান বিজ্ঞানীরা।

ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা: ওজন এক, কিন্তু ক্ষতি ভিন্ন

গবেষকেরা টানা ১৬ সপ্তাহ ধরে গবেষণাগারে ইঁদুরের দুটি দলের ওপর এই পরীক্ষা চালান। দুটি দলকেই সমপরিমাণ স্বল্প-চর্বিযুক্ত (লো-ফ্যাট) খাবার দেওয়া হয়। তবে পার্থক্য ছিল এক জায়গায়—প্রথম দলটির খাবারে সাধারণ টেবিল সুগার বা সুক্রোজ রাখা হয়েছিল, আর দ্বিতীয় দলটির খাবার থেকে চিনি পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়।

গবেষণা শেষে দেখা যায়, দুই দলের ইঁদুরের ওজন প্রায় একই রকম থাকলেও যারা পুরোপুরি চিনি ছাড়া খাবার খেয়েছিল, তাদের শরীরে বেশ কিছু গুরুতর শারীরিক জটিলতা দেখা দিয়েছে:

  • ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি: চিনি ছাড়া থাকা ইঁদুরগুলোর রক্তে শর্করার (ব্লাড সুগার) মাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যায় এবং তাদের কোষে ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়—যা প্রকারান্তরে ডায়াবেটিসের পূর্বলক্ষণ।
  • অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট: চিনি পুরোপুরি বাদ দেওয়ায় ইঁদুরগুলোর অন্ত্রে (Gut) থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ফলে তাদের পেটে ও অন্ত্রে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
  • ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি: সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, চিনিবর্জিত ইঁদুরগুলোর লিভারে (যকৃৎ) এমন কিছু নেতিবাচক পরিবর্তন ধরা পড়ে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘ফ্যাটি লিভার’ রোগের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে পরিচিত।

কেন এমন ঘটে? চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা

মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীর সচল রাখতে এবং শক্তি উৎপাদনে গ্লুকোজ বা কার্বোহাইড্রেটের একটি সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। আমরা যখন প্রাকৃতিকভাবে বা পরিমিত মাত্রায় চিনি গ্রহণ করি, তখন অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো তা থেকে এক ধরনের শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে, যা আমাদের পরিপাকতন্ত্র ও লিভারকে সুরক্ষিত রাখে। চিনি বা শর্করা একেবারে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনলে শরীর তার শক্তির ভারসাম্য মেলাতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ বিপাকীয় ক্রিয়ার ক্ষতি করে ফেলে।

প্রাকৃতিক বনাম কৃত্রিম চিনি

এখানে মনে রাখা জরুরি, চিকিৎসকেরা যে চিনি বাদ দেওয়ার কথা বলেন তা মূলত প্রক্রিয়াজাত সাদা চিনি, কোমল পানীয় বা মিষ্টির ‘অ্যাডেড সুগার’। কিন্তু ফলমূল, শাকসবজি বা দুধে থাকা প্রাকৃতিক চিনি (ফ্রুক্টোজ ও ল্যাকটোজ) শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সম্পূর্ণ কার্বোহাইড্রেট বা চিনিমুক্ত ডায়েট অনেক সময় হিতে বিপরীত হতে পারে।

মানুষের ক্ষেত্রে এটি কতটা প্রযোজ্য?

গবেষণার প্রধান গবেষক স্পষ্ট করেছেন যে, যেহেতু এই পরীক্ষাটি প্রাণীর ওপর চালানো হয়েছে, তাই এর ফলাফল সরাসরি মানুষের ওপর একশো ভাগ মিলিয়ে ফেলা যাবে না। মানুষের শরীরের জটিল হরমোন ও মেটাবলিজমের ওপর এর সুনির্দিষ্ট প্রভাব বুঝতে আরও দীর্ঘমেয়াদি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

তবে এই গবেষণা পুষ্টিবিদদের একটি পুরোনো তত্ত্বকেই আবার প্রমাণ করল—"অতি কোনো কিছুই ভালো নয়।" অতিরিক্ত চিনি খাওয়া যেমন বিষের মতো ক্ষতিকর, তেমনি সুস্থ থাকার অন্ধ মোহে কোনো প্রধান খাদ্য উপাদানকে জীবন থেকে একবারে ‘জিরো’ করে দেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। দীর্ঘমেয়াদে সুস্থতার আসল চাবিকাঠি হলো পরিমিতিবোধ ও সুষম খাদ্যাভ্যাস।

Link copied!