এআই এর অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ, নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগের চিন্তা সরকারের

  • নিউজ ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ১১:৫৫ এএম
এআই এর অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ, নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগের চিন্তা সরকারের

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। এআই ব্যবহার করে ডিপফেক তৈরি করে মানুষকে হয়রানিসহ নানা ধরনের অপব্যবহার, এমনকি শিশুদের লক্ষ্য করেও অপতৎপরতা চালানোর ঘটনায় সামাজে উদ্বেগ বাড়ছে। একইসঙ্গে এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মাঝেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।-বাসস

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও এআই ব্যবহার করা হচ্ছে।

দেশে-বিদেশে স্বার্থান্বেষী মহল কার্যক্রম-নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমত তৈরির লক্ষ্যে মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ, মতামত ও ছবি প্রচার করছে।

এআইয়ের অপব্যবহার পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা আশঙ্কা করছি, এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌম নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।’

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ‘সাইবার স্কোয়াড’ নামে বেশ কয়েকটি গোষ্ঠীকে শনাক্ত করেছেন, যারা সমালোচকদের কাছে ‘বট বাহিনী’ নামে পরিচিত। কার্যক্রম-নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলটির পক্ষে অবস্থান নিয়ে তারা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

নিরাপত্তা সংস্থায় কর্মরত এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই ব্যবহার করে তৈরি করা বিভ্রান্তিকর গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী ও শিল্পীদের মতো গণ্যমান্য ব্যক্তিদের চরিত্রহনন এবং সুনাম ক্ষুণ্ন করার হীন তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে।’

এআই হলো এমন এক ধরনের বিশেষ সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশন, যা বিভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে লেখা তৈরি, ছবি ও ভিডিও তৈরি এবং তথ্য বিশ্লেষণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা খাতে দৈনন্দিন উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং কাজের গতি ত্বরান্বিত করতে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে।

তবে এআইয়ের অপব্যবহারের কারণে অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ভরযোগ্য, বোধগম্য ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য এআই ব্যবস্থা তৈরিতে উদ্যোগী হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, দ্রুত বিকাশমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

অ্যানথ্রপিক আশঙ্কা করছে, এআই এমনকি সমগ্র মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করার কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। গুগল ডিপমাইন্ডও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিবিসিও এক প্রতিবেদনে এ বিষয়টি তুলে ধরেছে।

চলতি মাসের শুরুতে ওপেনএআইয়ের প্রধান বিজ্ঞানী ইয়াকুব পাচোস্কি এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি ও প্রসার নিয়ে চরম সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এআইয়ের ভবিষ্যৎ যাতে মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তা নিশ্চিত করতে আরও হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে।

সম্প্রতি এক খোলা চিঠিতে এআই-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তত ১ হাজার ৩০০ জন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরির রাশ টানতে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণে আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে সমর্থন দেওয়ার  আহ্বান জানিয়েছেন।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সরকারের নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা  বলেন, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া, বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কনটেন্টের কারণে দেশের সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি হচ্ছে উল্লেখ করে তারা তা প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছন।

এআইয়ের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকির কথা স্বীকার করে তারা প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর কঠোর প্রয়োগের জরুরি প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

বুধবার ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশ বর্তমানে ডিজিটাল ও সাইবার ক্ষেত্রে ‘অপরাধের দ্রুত বিবর্তন’ প্রত্যক্ষ করছে। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি সরকারকে পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং পুলিশের রেঞ্জ সদর দপ্তরগুলোতে আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট ও গবেষণাগার স্থাপনের পরিকল্পনা নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

এর আগে ১৭ মার্চ ভিয়েনায় ‘গ্লোবাল ফ্রড সামিট’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্টের ব্যাপক বিস্তার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রয়োজন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সন্ত্রাসবাদ, মাদক, মানবপাচার, দুর্নীতি ও আর্থিক জালিয়াতির বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করায় বাংলাদেশ এআই-ভিত্তিক অপরাধ শনাক্তকরণ ও আইন প্রয়োগের সক্ষমতা জোরদার করছে।

সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য সহায়ক পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে মানহানিকর বক্তব্য, ভুল তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অনেক দেশে বর্তমানে ৪৪ শতাংশ অপরাধ সাইবার পরিসরে সংঘটিত হচ্ছে। বাংলাদেশও এ বিপদ থেকে নিরাপদ নয়। অনলাইন জালিয়াতি, যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে ব্ল্যাকমেইল, নারীদের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং সামাজিক ও ধর্মীয় শৃঙ্খলা বিনষ্টের মতো কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সময়োপযোগী আইনের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ কাদের গনি চৌধুরী সম্প্রতি এক মুক্ত আলোচনায় বলেন, ভুয়া আইডি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীলতা ছড়ানো এবং নারী, শিশু ও সমাজে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অনলাইনে হয়রানি কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করা হলে সামাজিক অশ্লীলতা বাড়বে এবং সভ্যতা কলঙ্কিত ও কলুষিত হবে।

একই সঙ্গে কাদের গনি চৌধুরী প্রস্তাবিত সাইবার সিকিউরিটি আইনটি সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, কোনো সরকারি সংস্থা নাগরিকদের সাইবার অধিকার লঙ্ঘন করলে তার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।

এম

Link copied!