মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে পেছনে ফেলবে বাংলাদেশ!

  • নিউজ ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ১১:০২ পিএম
মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে পেছনে ফেলবে বাংলাদেশ!

চলতি বছরে এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। 

জিডিপি হলো নির্দিষ্ট সময়ে একটি দেশের ভেতরে উৎপাদিত সমস্ত পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্য। সামগ্রিক জিডিপির আকারে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় আট গুণ বড় হলেও, মোট জনসংখ্যা দিয়ে জিডিপি ভাগ করে হিসাব করা মাথাপিছু জিডিপিতে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশকে পেছনে ফেলতে যাচ্ছে ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশ বাংলাদেশ।

আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াবে ২ হাজার ৮৮৬ মার্কিন ডলারে। অন্যদিকে ভারতের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি হবে ২ হাজার ৭৪৭ মার্কিন ডলার। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। গত দুই দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সফল অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে পাকিস্তানের চেয়েও বড়।  

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের এই সাফল্যের মূলে রয়েছে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং জিডিপির ধীরগতি বর্তমানে এই প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। চলতি বছরে যেখানে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩.৬ শতাংশে।

তাহলে মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে পেছনে ফেলছে বাংলাদেশ— এই তথ্যের অর্থ আসলে কী? অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে হিসেব আসছে তার বা অর্থ কী? 

কী আছে আইএমএফের প্রতিবেদনে

আইএমএফের ২০২৬ সালের অক্টোবর ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে দুটি প্রধান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটের প্রভাবে ভারত এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, তার একটি চিত্র উঠে এসেছে।

২০২৬ সালে বাংলাদেশের মোট জিডিপি হবে ৫০৬.৪ বিলিয়ন ডলার, আর ভারতের ৪.১৫ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) বিবেচনায় মাথাপিছু জিডিপিতে ভারত এগিয়ে রয়েছে। পিপিপি সূচকে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ১২ হাজার ৯৯৮ ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াবে ১০ হাজার ৮৮৪ ডলারে।

পিপিপি হলো একটি অর্থনৈতিক সূচক, যা স্থানীয় জীবনযাত্রার ব্যয় সমন্বয় করে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা নির্ধারণ করে। এই সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশি নাগরিকদের চেয়ে ভারতীয়দের ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি।

মূল্যস্ফীতির চিত্রে আইএমএফ জানিয়েছে, ভারতে গড় ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশে তা ৮.৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা ঢাকায় জীবনযাত্রার অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপকে নির্দেশ করে।

ভারতে যেখানে ২০২৬ সালে ৭ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তা বাংলাদেশের ৩.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ। 

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গড় মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৭ হাজার ৭৪৬ ডলার এবং বৈশ্বিক গড় মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ১৫ হাজার ৮৮৯ ডলার। সেখানে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ২ হাজার ৮৮৬ ডলার ও ভারতের ২হাজার ৭৪৯ ডলার। 

কোনো পথে বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতি  

আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী বছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি বেড়ে ৩ হাজার ২১৯ ডলারে পৌঁছাবে, যা ভারতের সম্ভাব্য ৩ হাজার ০৩৬ ডলারের চেয়ে বেশি থাকবে। ২০২৮ সাল পর্যন্ত এই সামান্য ব্যবধান বজায় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে বর্তমান প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বজায় থাকলে ভারত ২০২৯ সালে ৩,৬৬১ ডলার মাথাপিছু জিপিডি দিয়ে আবারও বাংলাদেশকে ফেছনে ফেলবে। ওই বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি থাকবে ৩ হাজার ৩৩৪ ডলার।  

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মাথাপিছু জিডিপি দিয়ে একটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্র বোঝা সম্ভব নয়; কারণ এটি আয় ও সম্পদের বৈষম্যকে আড়াল করে। এ ছাড়া ডলারের বিপরীতে মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণেও বাস্তবে উৎপাদন না বেড়ে বা কমে এই সংখ্যায় পরিবর্তন আসতে পারে।

গত দুই দশকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মূলত রপ্তানিমুখী পোশাক খাত ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে ভারত একটি বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি বজায় রেখেছে, যেখানে শিল্প ও কৃষির পাশাপাশি সেবা খাত, প্রযুক্তি শিল্প ও বড় অভ্যন্তরীণ বাজার মূল ভূমিকা পালন করছে। তবে উভয় দেশেই প্রবৃদ্ধির সুবিধা ধনী পরিবারগুলোর হাতে পুঞ্জীভূত হওয়ার ফলে আয় বৈষম্য বেড়েছে।

বাংলাদেশ কি সফল?

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশ কি নতুনো কোনো সফলতার নাম? এর জবাবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দিলেও আয় বৈষম্য নিয়ে সতর্ক বার্তা দিয়েছেন তারা।

ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রা আল জাজিরাকে জানান, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ বার্ষিক গড়ে ৬ শতাংশ হারে টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে। বাংলাদেশের জিডিপিতে শিল্প উৎপাদনের অবদান ২০১৪ সালের ১৬.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ভারতের জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ২০১৪ সালের ১৫.১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ১৩.৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক বৈশ্বিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌযান চলাচলে বাধার কারণে তেল ও এলএনজি সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ, কারণ দেশটি তার ব্যবহৃত জ্বালানির ৯৫ শতাংশই আমদানি করে। একই সাথে লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি যোগান দেওয়া তৈরি পোশাক খাতও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।  সূত্র: আল জাজিরা

এম

Link copied!