স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যে ভাঙনের সুর

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ১১:৪২ এএম
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যে ভাঙনের সুর

ফাইল ছবি

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের কৌশল নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে টানাপোড়েন ও ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করতে চাইলেও জোটের কয়েকটি শরিক দল চাচ্ছে জোটবদ্ধভাবে অংশ নিতে। এ নিয়ে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা না হলে শরিকদের কেউ কেউ বিকল্প জোটে নির্বাচনের কথা ভাবছে, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জোটের শরিক দলগুলোর প্রধান যুক্তি হলো, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আন্দোলনে একসঙ্গে থাকার পর স্থানীয় নির্বাচনে সমন্বয় না করা হলে এই ঐক্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেকাংশে কমে যাবে। তাদের মতে, স্থানীয় নির্বাচনে জোটের প্রশ্নটি শুধু প্রার্থী সমন্বয়ের নয়; এর সঙ্গে শরিক দলগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব, সাংগঠনিক বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী অবস্থানও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

জাতীয় নির্বাচনে যেসব আসনে তাদের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, স্থানীয় নির্বাচনেও সেসব এলাকায় দলীয় প্রার্থীর সমর্থন পাওয়া জরুরি। এতে তৃণমূলে দলগুলোর ভিত্তি তৈরি হবে এবং ভবিষ্যতে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করলে শরিকদের জন্য সেই সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে বলে তারা উদ্বিগ্ন।

অন্যদিকে, জামায়াতের পক্ষ থেকে একক নির্বাচনের পক্ষে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। দলটির নেতাদের ভাষ্যমতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো নয়। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে বিপুলসংখ্যক পদে প্রার্থী বাছাই এবং কেন্দ্রীয়ভাবে সমঝোতা করা অত্যন্ত কঠিন।

তাছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক শক্তি ও আঞ্চলিক হিসাব সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই কেন্দ্রীয়ভাবে আসন ভাগাভাগি না করে স্থানীয় নেতৃত্বের ভিত্তিতে নির্বাচন করতে চায় দলটি। অতীতে বিএনপির সঙ্গে জোটেও কেন্দ্রীয়ভাবে আসন ভাগাভাগি না হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন করার ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনেছে জামায়াত।

এছাড়া দলটির ভেতরের হিসাব বলছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরিকদের আসন ছেড়ে দিতে গিয়ে জামায়াতের কয়েকটি আসনে সম্ভাবনাময় প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া যায়নি। অন্তত তিনটি আসনে স্থানীয় নেতারা কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। স্থানীয় নির্বাচনে আবারও শরিকদের জন্য ছাড় দিতে গেলে দলের ভেতরে সাংগঠনিক অসন্তোষ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনে জোটের আসন সমঝোতার কারণে জামায়াতের প্রকৃত জনসমর্থন কোন এলাকায় কতটা, তা নির্ণয়ের সুযোগ সীমিত ছিল। স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে অংশ নিলে সেই সাংগঠনিক শক্তি ও চিত্রও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছে দলটি। তবে পুরোপুরি কড়াকড়ি না রেখে কেন্দ্রীয়ভাবে জোটের সিদ্ধান্ত না থাকলেও, জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে শরিক দলগুলো নিজেরা আলোচনা করে একক প্রার্থী ঠিক করলে কেন্দ্র থেকে বাধা দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে জামায়াতের এই এককভাবে এগোনোর নীতির ফলে কওমি ধারার দলগুলো বিকল্প মেরুকরণের দিকে ঝুঁকছে। হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে সম্প্রতি ‘সমমনা ইসলামী দলসমূহ’ নামে সাতটি রাজনৈতিক দল নিয়ে নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টিও রয়েছে।

গত ২২ অক্টোবর হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব সাজিদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ২১ সদস্যের একটি লিয়াজোঁ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। আগামী ৫ ডিসেম্বর পরবর্তী বৈঠকে এই প্ল্যাটফর্মের কাঠামো ও কর্মপন্থা চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও নতুন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়া দলগুলো পুরোনো জোট ছাড়বে কি না, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি এবং কোনো কোনো দল দুই প্ল্যাটফর্মেই থাকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এককভাবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে শতাধিক উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে সমর্থিত প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং উত্তরে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রার্থী করার ঘোষণা দিয়েছে এনসিপি।

অন্যদিকে জামায়াতও দক্ষিণে আবু সাদিক কায়েম এবং উত্তরে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এর ফলে দুই দলের আলাদা প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তে স্থানীয় নির্বাচনে তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে।

সব মিলিয়ে, জামায়াত শেষমেশ কোন পথে হাঁটবে তা অনেকটাই নির্ভর করছে সার্বিক রাজনৈতিক পরিবেশ ও নির্বাচনের চিত্রের ওপর। দলটি সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই করে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করলেও ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ২৯ অক্টোবরের উপনির্বাচন এবং সার্বিক নির্বাচনী পরিবেশ কতটা অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

নির্বাচন সুষ্ঠু হলে এককভাবে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ হবে বলে মনে করছেন জামায়াত নেতারা। তবে শেষ পর্যন্ত মাঠের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও স্থানীয় সমীকরণই নির্ধারণ করবে ১১ দলীয় ঐক্যের ভবিষ্যৎ এবং স্থানীয় নির্বাচনের চূড়ান্ত চিত্র।

এসএইচ 

Link copied!