সারা দেশ থেকে ফেরত আসছে ৩০ লাখ বই

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ১০:২১ এএম
সারা দেশ থেকে ফেরত আসছে ৩০ লাখ বই

ফাইল ছবি

ঢাকা: আসন্ন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের মুখে সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো ২০-৩০ লাখ বই ফেরত নিয়ে দাঁড়িপাল্লার বদলে মানুষের মস্তিষ্কের ছবি যুক্ত করে পুনরায় ছাপিয়ে সরবরাহ করা হবে। এতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয় হবে। প্রতিটি পাঠ্যবই ছাপাতে বর্তমানে খরচ হয় ৫৭ টাকা। গত বৃহস্পতিবার রাতে বইটির মুদ্রণ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সংশোধিত বই মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপার কাজ চলছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী ও দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও বই রয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে ছাপা হচ্ছে ২২ কোটির বেশি বই। প্রাথমিক স্তরের বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার। সব মিলিয়ে বই ছাপার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত বাঁধাই, কাটিং ও প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) শেষে সরবরাহ করা হয়েছে ৭৬ শতাংশ বই। অন্যদিকে প্রথম দফায় দরপত্র হওয়া মাধ্যমিক স্তরের ২০ কোটি ৮৪ লাখের বেশি বইয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ ছাপার কাজ শেষ হয়েছে গতকাল পর্যন্ত। এর মধ্যে আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে সরবরাহ করা হয়েছে ৪০ শতাংশ বই। প্রাথমিকের বই ছাপা শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস পর মাধ্যমিকের বই ছাপা শুরু হয়।

জানা গেছে, আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তন আনছে এনসিটিবি। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা যুক্ত করার বিষয় রয়েছে। এছাড়া আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির বই দুটি হলো ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’। ষষ্ঠ শ্রেণির বই দুটি হলো ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’। এছাড়া নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে যুক্ত করা হচ্ছে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ। পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা-সম্পর্কিত বর্ণনাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এ বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের পাঠ্যবই, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংশোধিত বই এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে প্রস্তুত করা বইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনা তিন ধরনের রূপ পাচ্ছে। অন্যদিকে আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির বই দুটি হলো ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’। ষষ্ঠ শ্রেণির বই দুটি হলো ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, রবিবার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সভা ডাকা হয়েছে। ঐ সভায় অনুমোদন পেলে এ চারটি বইয়ের ছাপার কার্যাদেশ দেওয়া হবে।

একটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধিত নির্বাচনি প্রতীক পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহারের ঘটনায় বই প্রণয়নপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এনসিটিবির দাবি, ২০২৫ সালের বইয়ের পুরোনো নকশাটি ভুলক্রমে পুনরায় যুক্ত হয়েছে। তবে ঘটনাটিকে নিছক ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, পাঠ্যপুস্তকে রাজনৈতিক প্রতীকের ব্যবহার কোনো আদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হলে তা শিক্ষার বস্তুনিষ্ঠতা ক্ষুণ্ন করে। প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনে তিনি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

মাঠপর্যায়ের বই ফেরানোর উদ্যোগ: এনসিটিবি সূত্র জানায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের মুদ্রণকাজ কয়েক দিন আগে শেষ হয়েছে। বইগুলো জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও পাঠানো হয়েছে। নকশায় ত্রুটি শনাক্ত হওয়ায় সেগুলো ফিরিয়ে সংশোধনের সিদ্ধান্ত হয় গত শুক্রবারের অনলাইন সভায়। এনসিটিবির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, মাঠপর্যায়ে পাঠানো বই ফিরিয়ে আনতে জেলা ও উপজেলা কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনলাইন সভা হয়েছে। বই সংগ্রহ করে সংশোধনের পর আবার পাঠানো হবে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সংশোধিত বই সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে। এনসিটিবির আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো ভুল তথ্য না পায়, তা নিশ্চিত করতে তারা কাজ করছেন।

বাড়তি ব্যয় ও সময়ের চাপ: এনসিটিবি সূত্র জানায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বই ছাপানো হচ্ছে প্রায় ৩৮ লাখ কপি। এর বেশির ভাগের মুদ্রণকাজ শেষ হয়েছে। সব শ্রেণি মিলিয়ে আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপানো হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির এক সদস্য জানিয়েছেন, এরই মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির এই বই প্রায় ২০ লাখ ছাপা শেষে মাঠপর্যায়ে চলে গেছে। এসব বই ফেরত আনার প্রক্রিয়া চলমান। ফেরত আনা, সংশোধন ও পুনর্মুদ্রণ করতে বড় অঙ্কের অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি সময়ক্ষেপণও হবে। অথচ চলতি বছরের মধ্যে মাঠপর্যায়ের সব বই পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার রয়েছে সরকারের। তবে মুদ্রণ মালিকদের ভাষ্য, আইসিটি বইয়ের ছাপা, বাঁধাই ও সরবরাহের কাজ আগেই শেষ হয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে অন্তত ৩০ লাখ বই।

প্রতীক বদলের ধারাবাহিকতা: ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের ‘উপাত্ত ও তথ্য’ অধ্যায়ে জ্ঞানের পিরামিডের চারটি স্তর—উপাত্ত, তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দেখানো হয়েছে। এতে প্রথম স্তরে বৃত্তাকার প্রতীক, দ্বিতীয় স্তরে পরমাণু বা নেটওয়ার্কসদৃশ চিত্র, তৃতীয় স্তরে মস্তিষ্ক এবং সর্বোচ্চ স্তর প্রজ্ঞায় দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার করা হয়। ২০২৫ সালের বইয়ে থাকা দাঁড়িপাল্লার ছবিটি ২০২৬ সালের সংস্করণ বদলে মস্তিষ্কের ছবি যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৭ সালের নকশায় পুরোনো ছবিটি আবার ফিরে আসে। দাঁড়িপাল্লা একটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধিত নির্বাচনি প্রতীক হওয়ায় এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এনসিটিবি এখন ‘প্রজ্ঞা’ শব্দটি অপরিবর্তিত রেখে দাঁড়িপাল্লার বদলে মস্তিষ্কের ছবি যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। নির্ধারিত সময়ে সংশোধিত বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানোই এখন সংস্থাটির বড় চ্যালেঞ্জ।

এসআই

Link copied!