ছবি : প্রতিনিধি
চুয়াডাঙ্গ: বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ, যেখানে মৎস্যসম্পদ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম , ফলে বিপুল পরিমাণ মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় উপজাত হিসেবে মাছের আঁইশ (Fish Scale) উৎপন্ন হয়। একসময় এই আঁইশকে বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হলেও বর্তমানে এটি একটি উচ্চমূল্যের শিল্প কাঁচামাল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সঠিক ব্যবস্থাপনায় মাছের আঁইশ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন বাংলাদেশের নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মাছের আঁইশ এখন বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে দেশের জন্য বয়ে আনছে বৈদেশিক মুদ্রা। এছাড়া মাছের আঁশ ছাড়ানো বা মাছ কাটাকে পেশা হিসেবে নিয়ে সাবলম্বী হচ্ছেন চুয়াডাঙ্গার অনেকে পরিবার। বেসরকারি সংস্থা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় মাছের ফেলনা এই অংশ বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল অর্থ আয় হচ্ছে।
জেলা মৎস্য অফিসসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলাসহ জেলার স্থানীয় অনেক ব্যবসায়ীই এখন মাছের আঁইশ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় বাজার থেকে মাছের আঁইশ প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে জাপান, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়ায়। চুয়াডাঙ্গা শহরের বাজার ঘুরে দেখা গেছে ব্যবসায়ীরা মাছের আঁইশ ফেলে না দিয়ে জমিয়ে রাখছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই মাছের আঁইশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে লিপস্টিক, প্রসাধনী সামগ্রী, ক্যাপসুলের আবরণ বা ক্যাপসহ বিভিন্ন পণ্য।
যারা বিভিন্ন বাজারে মাছ কাটেন তারা এই মাছের আঁইশ ফেলে না দিয়ে সংগ্রহ করে রাখেন। পরবর্তী সময়ে তা ধুয়ে পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে ঝরঝরে করে বিক্রি করেন ব্যাপারীদের কাছে। এরপর সেই আঁইশগুলোকে ব্যাপারীরা বিক্রি করেন পাইকারী ব্যবসায়ীদের কাছে বছরে দুই থেকে তিন বার। প্রতি মণ আঁইশ বিক্রয় করা হয় দুই থেকে চার হাজার টাকায়।
মাছের আঁইশকে বাজারজাতযোগ্য পণ্যে রূপান্তরের জন্য মাছ কাঁটার পর আঁইশ সংগ্রহের পর তা আকার ও গুণগত মান অনুযায়ী বাছাই করা হয় এবং পরিষ্কার পানিতে একাধিকবার ধোয়া হয়। শুকানোর জন্য প্রাকৃতিক সূর্যালোক সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি, যা আর্দ্রতা ১০%-এর নিচে নামিয়ে আনে এবং পচন রোধ করে। রোদে শুকিয়ে ঝরঝরে করে বিক্রি করেন ব্যাপারীদের কাছে। বাংলাদেশে মাছের আঁইশ প্রধানত রপ্তানিমুখী পণ্য। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শুকনো ও প্রক্রিয়াজাত মাছের আঁইশ বিদেশে রপ্তানি করছে এবং বছরে শত শত মেট্রিক টন পণ্য সরবরাহ করছে।
মাছ কাটা পেশায় জড়িত অনেকে জানিয়েছেন, এ পেশায় তাদের সাবলম্বী হওয়ার গল্প। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার শহরতলীর জিনতলা এলাকার বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বড় বাজারের মাছ কাটেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন প্রায় ১৫-২০ কেজি আঁইশ হয়। এগুলো আমরা আগে ফেলে দিতাম কিন্তু এখন এগুলো বিক্রি করে মাসে ৩-৪ হাজার টাকা বাড়তি আয় হচ্ছে।
বড় বাজারে শরীফ উদ্দীন নামে আরেক মাছ কাটা ব্যবসায়ী বলেন, প্রতিদিন মণ খানেক মাছ কাটি। মাছ কেটে যেটা আয় হয় তার পাশাপাশি বাড়তি আয় হয় আঁইশ বিক্রি করে। এগুলো বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বলে আমরাও দাম ভালো পাচ্ছি।
দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা বাসস্ট্যান্ড বাজারে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে মাছ কাটেন শুকুর আলী। তিনি বলেন, আগে আমরা মাছের আঁইশ ফেলে দিতাম। পরে যখন জানতে পারলাম এগুলো বিদেশে বিক্রি হচ্ছে তখন থেকে আঁইশ জমিয়ে বিক্রি শুরু করি। ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আমাদেরকে প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে।
মাছের আঁইশের পাইকারী ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন বাজার থেকে মাছের আঁশগুলো সংগ্রহ করেন। এরপর বস্তাবন্দি করে ঢাকা, চট্রগ্রাম পাঠিয়ে দেন সেখানে প্রক্রিয়াকরণ শেষে বিদেশে রপ্তানি হয়।
ওয়েভ ফাউন্ডেশনের মৎস্য কর্মকর্তা সাঈদ-উর-রহমান বলেন, পল্লী-কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় মাছ কাটা ব্যবসায়ীদের মাছের আঁইশ সংগ্রহের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। মাছের আঁইশ, যা একসময় বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত হতো, এখন তা একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই খাতে উদ্যোক্তা তৈরি হলে একদিকে যেমন পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে। পরিকল্পিত উদ্যোগ, প্রযুক্তি ও বাজার সংযোগের মাধ্যমে মাছের আঁইশভিত্তিক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফরহাদুর রেজা বলেন, মাছের আঁইশ বিদেশে রপ্তানি শুরু হওয়ার পর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন একটি পথ সৃষ্টি হয়েছে। তৈরি হয়েছে নতুন আরও একটি পেশা।
তিনি আরও বলেন, একটা সময় এটি আবর্জনা ছিল এখন এটি সম্পদে পরিণত হয়েছে। এই মাছের আঁইশ থেকে জেলেটিন উৎপাদন হয় যা দিয়ে বিভিন্ন ঔষধ শিল্পে এবং বিভিন্ন প্রসাধনী তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে এর কারখানা নেই এজন্য বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। এটি নিয়ে অনেক ভালো একটা সম্ভাবনা রয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা বিভিন্ন বাজারে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করছি।
পিএস
আপনার মতামত লিখুন :