ঈশ্বরদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফের অর্থ লেনদেন ও রোগী হয়রানির অভিযোগ

  • ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএম
ঈশ্বরদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফের অর্থ লেনদেন ও রোগী হয়রানির অভিযোগ

ছবি : প্রতিনিধি

পাবনা: দালালমুক্ত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অভিযান চালিয়ে নয়জনকে আটক ও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়ার প্রায় সাত মাস পরও পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দালালদের দৌরাত্ম্য থাকার অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ প্যাথলজি বিভাগের একটি কক্ষকে কেন্দ্র করে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া এবং বেসরকারি ক্লিনিকের দালালদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।

এর আগে গত ১ মার্চ ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অভিযান চালিয়ে রোগী ও স্বজনদের হয়রানি এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগে দালাল চক্রের ৯ জনকে আটক করা হয়। ঈশ্বরদী উপজেলা প্রশাসন  পরিচালিত ওই অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালত আটক ব্যক্তিদের বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা করেন। তখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে দালালমুক্ত রাখতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) ঈশ্বরদী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ঈশ্বরদীর এমপিও ভুক্ত একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) ইসরাইল হোসেন অভিযোগ করেন, ছেলের ডেঙ্গু হাওয়া পরীক্ষা করতে এক সপ্তাহ আগে ও আজ মঙ্গলবার এসেও দেখেন দালালদের উৎপাত ও দৌরাত্ম আগের মতই আছে। দালালদের উৎপাতে সাধারন রোগীদের সেবা পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

এর তিন দিন আগে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি বিভাগের ১১০ নম্বর কক্ষকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে এক রোগী অভিযোগ করেন, সেখানে রোগী ও স্বজনদের অপেক্ষায় রেখে বেসরকারি ক্লিনিকের দালালরা বাইরে থেকে রক্ত এনে জমা দিচ্ছেন এবং অর্থের বিনিময়ে তাদের কাজ আগে করে দেওয়া হচ্ছে।

ভিডিওতে আরও অভিযোগ করা হয়, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সাধারণ রোগীরা সেবা পাচ্ছেন না। এমনকি নির্ধারিত সময়ের আগেই রোগীদের কক্ষ থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শোভন পালের সঙ্গে কথা হলে তিনি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দালালের উৎপাত বেশি থাকার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি জানান, এর আগে একজন আনসার সদস্য হাসপাতালের একটি কক্ষ থেকে এক দালালকে বের হয়ে যেতে বললে ওই ব্যক্তি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের গেটের কাছে ওই আনসার সদস্যকে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে বিষয়টি জানানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।

প্যাথলজি বিভাগের অভিযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, সংশ্লিষ্ট টেকনিশিয়ান, টেকনোলজিস্ট, আয়া ও সুইপারদের সঙ্গে কথা বলে তদন্ত করা হবে। কেউ দোষী প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।

প্রশ্ন উঠছে, মার্চের অভিযানের পরও কীভাবে?
গত মার্চের অভিযানে নয়জনকে আটকের ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঈশ্বরদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে দালালমুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছিল। এরপরও যদি হাসপাতালের ভেতরে দালালদের প্রবেশ, রোগী ভাগিয়ে নেওয়া কিংবা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে নজরদারি ও অভিযান কতটা কার্যকর হয়েছে—সেটি নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।

বিশেষ করে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে হাসপাতালের ভেতরে থাকা দালালদের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, রোগী বা স্বজনদের কাছ থেকে সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে অর্থ নেওয়া হচ্ছে কি না এবং হাসপাতালের কোনো কর্মচারী এ কাজে সহযোগিতা করছেন কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন রোগী ও স্থানীয়রা।

শুধু অভিযান নয়, স্থায়ী সমাধানের দাবি
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক বা সাজা দিলেই দালাল চক্রের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। হাসপাতালের প্রবেশপথ, বহির্বিভাগ, প্যাথলজি ও জরুরি বিভাগের আশপাশে নিয়মিত নজরদারি, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং রোগীদের অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

অন্যদিকে গত তিন দিন আগে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অভিযোগের তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা হবে এবং কেউ দোষী প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মার্চে নয়জন দালাল আটকের পর অক্টোবরেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় এখন দেখার বিষয়—তদন্তে অভিযোগগুলোর কতটা সত্যতা মেলে এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে সত্যিকার অর্থে দালালমুক্ত রাখতে প্রশাসন কী ধরনের স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়।

এএ/এসআই

Link copied!