ছবি : প্রতিনিধি
রাজশাহী: একদিকে হাজার কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসান, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম দামে চিনি বিক্রি। সঙ্গে রয়েছে তীব্র আখ সংকট। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ১৩ নভেম্বর থেকে আবারও উৎপাদনে যাচ্ছে রাজশাহী সুগার মিল। এবার ৬০ দিন আখ মাড়াই করে ৩ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে অতীতের অভিজ্ঞতায় এবারও নির্ধারিত সময়ের আগেই উৎপাদন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত মাড়াই মৌসুম শেষে রাজশাহী চিনিকলের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ৭০ কোটি টাকা। আগের মৌসুমে লোকসানের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৯ কোটি টাকা। বছরের পর বছর লোকসানের বোঝা বাড়লেও প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি।
চিনিকল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এবার আখের দাম মণপ্রতি ১১ টাকা বাড়িয়ে ২৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ১৩ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ৬০ দিন মাড়াই কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ মৌসুমে প্রায় ৭০ হাজার টন আখ মাড়াই করে ৩ হাজার টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চুক্তিবদ্ধ ৩ হাজার ৯০০ জন চাষির কাছ থেকে আখ সংগ্রহের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আখ ক্রয়কেন্দ্রগুলোও সচল করা হচ্ছে।
তবে আখের দাম বাড়িয়েও চাষিদের চিনিকলমুখী করা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে চিনিকলে আখ সরবরাহ করে মূল্য পেতে ভোগান্তি, অর্থ পরিশোধে বিলম্ব এবং তুলনামূলক কম লাভের কারণে অনেক চাষি আখ চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন। অনেকে চিনিকলে আখ সরবরাহ না করে নিজস্ব মাড়াই যন্ত্রে গুড় তৈরি করছেন। আবার কেউ কেউ আখের পরিবর্তে বেশি লাভজনক সবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে ঝুঁকছেন।
রাজশাহী চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাছুমা আকতার জাহান জানান, এবার ৭০ হাজার টন আখ মাড়াইয়ের মাধ্যমে ৩ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চুক্তিবদ্ধ চাষিদের পাশাপাশি সাধারণ চাষিরাও চিনিকলে আখ সরবরাহ করতে পারবেন। উৎপাদন শুরুর সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
উৎপাদন ব্যয়ের চিত্রও চিনিকলটির লোকসানের অন্যতম বড় কারণ। চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে প্রায় ৩০০ টাকা ব্যয় হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। অথচ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি কেজি চিনি বিক্রি করতে হয় ১২৫ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কেজি চিনিতে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় ১৭৫ টাকা কম পাওয়া যাচ্ছে। পুরোনো যন্ত্রপাতি, উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার না হওয়া এবং সারা বছর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বহন করতে গিয়ে ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়ছে।
চিনিকলের উৎপাদন বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ মাড়াই মৌসুমে ৬৭ কার্যদিবসে প্রায় ৬ হাজার ৯৩০ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু ৪৪ দিন মিল চালানোর পর আখ সংকটে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত চিনি উৎপাদিত হয় মাত্র ৩ হাজার ১৭১ টন। এর আগের মৌসুমে ৩ হাজার ৫৬৭ টন চিনি উৎপাদিত হয়েছিল। তার আগের তিন মৌসুমে (২০২১-২৪) সব মিলিয়ে উৎপাদন হয়েছিল মাত্র ৪ হাজার ৫৩৭ টন।
আখ চাষের পরিসংখ্যানেও সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে ৪০ হাজার ৮৬৭ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৩৪০ হেক্টরে। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানে আখের আবাদ কমেছে অর্ধেকেরও বেশি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে চিনিকলের কাঁচামাল সরবরাহ ও উৎপাদনে।
রাজশাহী চিনিকলের মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মো. সাদ্দাম হোসেন অবশ্য পুঞ্জীভূত ১ হাজার ৬৪ কোটি টাকাকে পুরোপুরি লোকসান হিসেবে দেখতে নারাজ। তাঁর দাবি, এটিকে দায় বলা অধিকতর যুক্তিসংগত। কারণ, চিনিকলের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও মানবসম্পদের মূল্য হিসাবের বাইরে রেখে পুঞ্জীভূত দায়কে নিট লোকসান হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
১৯৬২ সালে রাজশাহীর হরিয়ানে চিনিকলটির নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৯৬৫ সালে তা শেষ হয়। ১৯৭২ সালে জাতীয়করণের পরও প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক ছিল। তবে আশির দশকের শেষ দিকে উৎপাদন কমতে শুরু করে। বর্তমানে মিলটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ২০ হাজার টন হলেও বাস্তবে তার ধারেকাছেও উৎপাদন হচ্ছে না। বর্তমানে এখানে কর্মরত রয়েছেন ১ হাজার ৫ জন শ্রমিক-কর্মচারী।
সব মিলিয়ে আখের আবাদ কমে যাওয়া, চাষিদের অনীহা, পুরোনো যন্ত্রপাতি, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং চিনির বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ের বিশাল ব্যবধান—সবকিছু মিলিয়ে সংকটের বৃত্তে আটকে আছে রাজশাহী সুগার মিল। প্রতি বছর নতুন মৌসুমে উৎপাদনের আশা জাগলেও লোকসানের বোঝা কমছে না। এবারও সেই পুরোনো চ্যালেঞ্জ নিয়েই ১৩ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে আখ মাড়াই। প্রশ্ন উঠেছে, শুধু উৎপাদন শুরু করলেই কি ঘুরে দাঁড়াবে রাজশাহী সুগার মিল, নাকি লোকসানের বোঝা আরও বাড়বে?
পিএস