ফাইল ছবি
ঢাকা: অনিয়মের তদারকি করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতায় দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে ‘অবৈধ’ ব্যবসা করে যাচ্ছে দেশের বিমা কোম্পানিগুলো। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই দেশের সব ধরনের বিমা কোম্পানিকে নিবন্ধন নবায়ন সম্পন্ন করতে হয়। নিয়ম অনুযায়ি নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে কোম্পানিগুলো আবেদনও করেছে। তবে বাড়তি ফি আদায়ে দুই মাস পেরোলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোনো কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন অনুমোদন করেনি। যার ফলে বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাড়তি ফি আদায়ের ব্যর্থ প্রচেষ্টার ফলে ঝুঁলে আছে সব বিমা কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন।
আইনি ব্যাখ্যায় সব বিমা কোম্পানি বর্তমানে কার্যত নবায়নবিহীন অবস্থায় ব্যবসা পরিচালনা করছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাদের কার্যক্রম এখন কার্যত ‘অবৈধ’। নিবন্ধন নবায়ন ছাড়া কোনো কোম্পানি নতুন পলিসি ইস্যু, প্রিমিয়াম গ্রহণ, দাবি নিষ্পত্তি কোনো কাজই করতে পারে না। এখন দেশের সব বিমা কোম্পানিই অবৈধ হয়ে গেছে। কিন্তু এখানে বিমা কোম্পানিগুলোর কোনো দায় নেই, যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের ব্যবসা করতে নিষেধ করেনি।
বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর আইন অনুযায়ী, নিবন্ধন সনদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নবায়নের আবেদন ও ফি পরিশোধ করে আইডিআরএর কাছে আবেদন করতে হয়। নিবন্ধন নবায়নের জন্য প্রতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে বিমা কোম্পানিগুলো নির্ধারিত ফি দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আবেদন করে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিসেম্বরের মধ্যে নবায়ন সনদ কোম্পানিগুলোকে দিয়ে দেয়। কিন্তু এবার মে মাস (২০ মে) পার হতে চললেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোনো কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন করেনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
অথচ বিমা আইন অনুসারে, বৈধ নিবন্ধন ছাড়া কোনো কোম্পানি নতুন পলিসি ইস্যু, প্রিমিয়াম গ্রহণ বা দাবি নিষ্পত্তিসহ নিয়মিত কার্যক্রম চালাতে পারে না। তবে বাস্তবে দেশের সব জীবন ও সাধারণ বিমা কোম্পানিই স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিমা কোম্পানিগুলো নিবন্ধন নবায়নের আবেদন করার পর ফি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। আইডিআরএর সদ্য পদত্যাগ করা চেয়ারম্যান এম আসলাম আলমের উদ্যোগে ফেব্রুয়ারি মাসের ৪ তারিখে নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়িয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। মূলত বিমা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বাড়তি ফি আদায়ের লক্ষ্যে নবায়ন অনুমোদন করা হয়নি। ফেব্রুয়ারি মাসে নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়িয়ে গেজেট প্রকাশ করা হলেও বিমা কোম্পানিগুলো নিবন্ধন নবায়নের জন্য আবেদন করে গত নভেম্বরে। ফলে আগের ফি দিয়েই কোম্পানিগুলো আবেদন করে। এ কারণে বিমা কোম্পানিগুলো নিবন্ধন নবায়ন নিতে বাড়তি ফি পরিশোধ করতে নির্দেশ দিয়েছে আইডিআরএ। তবে কোম্পানিগুলো তার বিরোধীতা করে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন আচরণে এখন সব কোম্পানি কার্যত ‘অবৈধ’ হয়ে পড়েছে।
জানা যায়, বিমা ব্যবসার নিবন্ধন ফি বিধিমালা-২০১২ সংশোধন করে প্রকাশ করা গেজেট অনুযায়ী, ২০২৬, ২০২৭ ও ২০২৮ সালে নিবন্ধন নবায়ন ফি হবে প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের বিপরীতে ২ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ, কোনো কোম্পানি এক কোটি টাকা প্রিমিয়াম আয় করলে পরবর্তী বছরের নিবন্ধন নবায়নের জন্য তাকে ২৫ হাজার টাকা ফি দিতে হবে। এরপর ২০২৯, ২০৩০ ও ২০৩১ সালে হার বাড়িয়ে প্রতি হাজারে ৪ টাকা এবং ২০৩২ সাল ও তার পরবর্তীসময়ের জন্য ৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে এই হার ছিল প্রতি হাজারে ১ টাকা।
বর্তমান হার ০ দশমিক ১ শতাংশ থেকে চূড়ান্ত ধাপে ০ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হবে। অর্থাৎ, প্রতি হাজারে অতিরিক্ত ৪ টাকা বা ০ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তি ব্যয় বহন করতে হবে বিমা কোম্পানিগুলোকে। প্রথম ধাপেই (২.৫০ টাকা) কোম্পানিগুলোকে প্রতি হাজারে ১ টাকা ৫০ টাকা অতিরিক্ত দিতে হবে।
এই বিষয়ে একটি জীবন বিমা কোম্পানির মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাম প্রকাশ না করা শর্তে সোনালী নিউজকে বলেন, শুধু আমরা নই। অধিকাংশ কোম্পানি এ পর্যায় থেকে নিবন্ধন নবায়নহীন হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে বেগ পোহাতে হচ্ছে। আমাদের নিবন্ধন নবায়নের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত ব্যবসা বন্ধ রাখার কোনো নির্দেশনা নিয়ন্ত্রক সংস্থা দেয়নি। ফলে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে। কিন্তু কাগজপত্রে নবায়ন না থাকায় এটি আমাদের জন্য অস্বস্তিকর। তাছাড়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গ্রুপ বিমা করতেও সমস্যা হচ্ছে। কারণ তারা গ্রুপ বিমা করার সময় নিবন্ধন নবায়ন আছে কি না তা দেখতে চায়।
তিনি বলেন, আইডিআরএ উচিত এই বছর বিমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন দিয়ে পরবর্তীতে যদি কোন আইন কার্যকর হয় তা বাস্তবায়ন করা। যেহেতু ইতোমধ্যে চলতি বছরের অনেকগুলো মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে এখন আর এভাবে কোম্পানিগুলোকে নিবন্ধন নবায়ন অনুমোদনহীর রেখে ‘অবৈধ’ ব্যবসা করায় উৎসাহীত করা ঠিক হচ্ছে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত দ্রুত এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া এবং চলমান সংকটের সমাধান করা।
এ বিষয়ে আরেকটি বিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাম প্রকাশ না করার শর্তে সোনালী নিউজকে বলেন, ‘নিবন্ধন নবায়ন ছাড়া বিমা ব্যবসা করার সুযোগ নেই। কিন্তু বাড়তি নবায়ন ফি আদায়ের লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ দেশের সব বিমা কোম্পানিকে অবৈধ করে দিয়েছে। পাঁচ মাস সময় ধরে বিমা কোম্পানিগুলো অবৈধভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, নিবন্ধন ব্যয় বাড়ানোর কারণে মূলত গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কারণ ব্যয় বাড়ার কারণে বিমা গ্রাহকদের লভ্যাংশের পরিমাণ কমে যাবে। এমনিতেই কিছু কোম্পানি গ্রাহকদের দাবির টাকা ঠিকমতো পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে বিমার প্রতি মানুষের আস্থা সংকট রয়েছে। এখন গ্রাহকরা কম রিটার্ন পেলে এ খাতের প্রতি মানুষের আস্থা আরও নষ্ট হয়ে যাবে।’
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ি, দেশের বীমা খাতে ব্যবসা পরিচালনাকারী বেসরকারি কোম্পানিগুলোর ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়ন ফি নির্ধারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। রোববার (২৬ এপ্রিল) আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে এই বিষয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে, ২০২৬ সালে বীমা কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন ফি প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে কত টাকা হারে প্রযোজ্য হবে সে বিষয়ে নির্দেশনা বা আইনগত মতামত চাওয়া হয়েছে। তবে এখনো কোন মতামত বা কার্যত কোন নির্দেশনা না পাওয়ায় সব কিছু স্থবির হয়ে আছে। এদিকে সংকটময় বিমা খাতের কোম্পানিগুলো ‘বৈধ’ নাকি ‘অবৈধ’ এই বিষয়ে স্পষ্টতা না থাকায় শঙ্কায় পুরো বিমা খাত।
আইডিআরএর পরামর্শক (মিডিয়া ও যোগাযোগ) ও মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি সোনালী নিউজকে বলেন, বিমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন ফি সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে আমরা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে (এফআইডি) একটি চিঠি পাঠিয়েছি, কিন্তু সেখান থেকে আমরা এখনো কোন নির্দেশনা পাইনি। আমরা এফআইডির দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় আছি।
এএইচ/পিএস
আপনার মতামত লিখুন :