ফাইল ছবি
ঢাকা: পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ, অবণ্টিত লভ্যাংশ যোগ্য বিনিয়োগকারীকে বন্টন, শেয়ারের নিরাপদ সংরক্ষণ এবং বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড (সিএমএসএফ)। প্রতিষ্ঠানটিকে আরো বেশি বিনিয়োগকারীবান্ধব করতে উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন আইনেও পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ওই আইনের খসড়া প্রকাশিত হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) প্রণীত ‘বিএসইসি ক্যাপিটাল মার্কেট ক্যাপিটাল মার্কেট স্টেবিলাইজেশন ফান্ড আইন-২০২১’ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে সিএমএসএফ। প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগকারীদের পক্ষে অবণ্টিত নগদ লভ্যাংশ, বোনাস শেয়ার, রাইটস শেয়ারসহ বিভিন্ন সম্পদের কাস্টডিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যামান আইনটি বাতিল করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা আরো বাড়াতে ‘বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড (সিএমএসএফ) আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় বিএসইসি। এরই মধ্যে প্রস্তাবিত সিএমএসএফ আইন, ২০২৬ এর খসড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে (এফডিআই) প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে এটি যাচাই ও নীতিগত পর্যালোচনার জন্য অপেক্ষমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বিধামালাটি কার্যকর হলে সিএমএসএফ বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে একটি আধুনিক নগদ লভ্যাংশ বিতরণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাবে। এর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নগদ লভ্যাংশ বিতরণ প্রক্রিয়া আরও ডিজিটাল, স্বচ্ছ ও কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা একটি অর্থবছরে পাওয়া লভ্যাংশের ওপর উৎসে কর্তিত করের ট্যাক্স চালান ও ট্যাক্স ডিট্রাকশন সার্টিফিকেট একক প্ল্যাটফর্ম থেকে পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
এছাড়া, নতুন এই বিধামালার আওতায় সিএমএসএফ তার সঞ্চয় থেকে প্রাপ্ত সুদ আয় ও অন্যান্য বৈধ আয়ের একটি অংশ ব্যবহার করে পুঁজিবাজারের সামগ্রিক উন্নয়নে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেটের (বিআইসিএম) আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচিতে সহায়তা, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি বাড়াতে সহযোগিতা এবং তালিকাচ্যুত কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়নে সহায়তা এবং পুঁজিবাজারের অন্যান্য অংশীজনদের দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রমে এই অর্থ ব্যয় করতে পারবে। এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়ানো, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং একটি টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
পুঁজিবাজারে সিএমএসএফ কেন প্রয়োজন-
পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘ বছরের দাবি আদায়ের সহজ ও স্বচ্ছ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ২০২১ সালে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি কর্তৃক সিএমএসএফ গঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানটির অধীনে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এই সম্পদের বড় অংশই পুঁজিবাজারের কোম্পানিগুলোর দীর্ঘ বছরের অবন্টিত লভ্যাংশের অর্থ। এই প্রতিষ্ঠানটির ওইসব সম্পদ একত্রিত করে যোগ্য দাবিদারের কাছে পৌঁছে দেয়।
প্রতিষ্ঠানটি গঠনের পর এরই মধ্যে ৫ হাজারের বেশি বিনিয়োগকারীকে তাদের যোগ্য দাবির বিপরীতে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার নগদ অর্থ ও শেয়ারমূল্য সফলভাবে হস্তান্তর করেছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর সর্বনিম্ন ২৮ টাকা দাবি থেকে বড় বিনিয়োগকারীর ১ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। ওই বিশাল অংকের দাবি পরিশোধ করার পরও প্রতিষ্ঠানটির কাছে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার নগদ তহবিল এবং প্রায় ৭০০ কোটি টাকার শেয়ার রয়েছে।
শুধু ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারী নয়, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানও অতীতে সিএমএসএফের মাধ্যমে তাদের প্রাপ্য লভ্যাংশ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, পুঁজিবাজারে তালিকাচ্যুত কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা ছিল বিনিয়োগ আটকে যাওয়া। কোনো কোম্পানি স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে তালিকাচ্যুত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য অর্থ বা শেয়ার নিষ্পত্তির কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তেন।
এমন পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পক্ষ থেকে সিএমএসএফের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারী সুরক্ষা ব্যবস্থাপনা হিসেবে কাজ করছে। তালিকাচ্যুত কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের দাবি যাচাই করে স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খলভাবে তাদের প্রাপ্য অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ বেক্সিমকো সিনথেটিকস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগকারীরা সিএমএসএফের কাছে শেয়ার হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে নগদ অর্থ গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন।
বাজার স্থিতিশীলতায় সিএমএসএফের অবদান বাড়বে-
অতীতে বাজারের প্রয়োজনে বিভিন্ন বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া এবং মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে সহায়তা করেছে সিএমএসএফ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালের বিদ্যমান বিধিমালার আওতায় দায়িত্ব পালন করছে। তবে প্রস্তাবিত সিএমএসএফ আইন কার্যকর হলে আরও সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা এবং আধুনিক সেবা প্রদানে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে সিএমএসএফের অপারেশন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. ওয়াসি আজম সোনালী নিউজকে বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি কার্যকর হলে নিয়মিত কার্যাক্রমের বাইরে সিএমএসএফ বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে একটি আধুনিক নগদ লভ্যাংশ বিতরণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি সিএমএসএফ’র এর বার্ষিক সুদ আয় ব্যবহার করে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হবে। বিশেষ করে বিনিয়োগকারীদের প্রশিক্ষিত করে তুলতে এই অর্থায়ন বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
এএইচ/পিএস