ফাইল ছবি
আন্তর্জাতিক বাজারে বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক ব্যাংক সিটির দেওয়া সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী এক থেকে তিন মাসের মধ্যে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫০০ ডলারে পৌঁছে যেতে পারে। বছরের শেষ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হওয়া এবং ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে যাওয়ার ইতিবাচক আশাবাদ থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান এই ধাতুর দামে বড় ধরনের রেকর্ড ঊর্ধ্বগতির পূর্বাভাস দিয়েছে ব্যাংকটি। বাংলাদেশেও সোনার দাম বড় ধরনের বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যাংকটি জানায়, বছরের শেষ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা কমার পাশাপাশি ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যকার সংঘাতের তীব্রতা হ্রাস পাবে-এমন আন্তর্জাতিক পূর্বাভাসের ওপর ভর করেই বিশ্ববাজারে স্বর্ণের নতুন দর বৃদ্ধির এই প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দল বড় ধরনের সাফল্য পাওয়ার পর বিশ্ববাজারে ডলারের মান এবং মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের মুনাফার হার কমেছে। এই নিম্নমুখী প্রভাবের কারণেই আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম একলাফে প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ চূড়ায় গিয়ে পৌঁছেছে।
আজ আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৩৪ ডলার ৮৩ সেন্টে এসে ঠেকেছে। গত ২২ অক্টোবরের পর বিশ্ববাজারে এটাই স্বর্ণের সর্বোচ্চ দামের রেকর্ড। এর ঠিক আগের দিন অর্থাৎ গত বুধবার আন্তর্জাতিক মার্কেটে একদিনেই সোনার দাম ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছিল, যা গত ১৯ আগস্টের পর এক দিনে সর্বোচ্চ দরবৃদ্ধির নজির।
বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান এক্সএস ডটকমের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক লিন ট্রান জানান, মার্কিন ডলারের দরপতন এবং ট্রেজারি বন্ডের মুনাফা হ্রাস পাওয়ার কারণেই স্বর্ণের দাম আবার ৪ হাজার ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করেছে। তবে বিশ্ববাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধরে রাখতে হলে দামকে ৪ হাজার ডলারের ওপর বেশ কিছু দিন স্থিতিশীল থাকতে হবে। তাঁর মতে, বৈশ্বিক বিনিয়োগপ্রবাহ এবং ট্রেজারি বন্ডের মুনাফার পরিবর্তন অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম প্রথমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ২০০ ডলার এবং পরবর্তীতে তা ৪ হাজার ৪০০ ডলারের লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ঘটনা বৈশ্বিক পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের একটি বড় অনিশ্চয়তা কাটিয়ে তুলেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলার কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং একই সাথে বিশ্বের বড় বড় শেয়ারবাজারে দেখা দিয়েছে জোরালো চাঞ্চল্য। মূলত ডলারের দর কমলে অন্যান্য মুদ্রা ব্যবহারকারী দেশ বা ক্রেতাদের জন্য ডলারে মূল্যায়িত স্বর্ণ কেনা তুলনামূলক সস্তা ও সহজ হয়, যা বিশ্বজুড়ে এই ধাতুর সার্বিক চাহিদা ও ক্রয়প্রবণতা বাড়াতে মূল ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মুনাফা ওভারনাইট ৬ বেসিস পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। টোকিওর শেয়ারবাজারে দিনের শুরুতেই এই মুনাফার হার আরও ১ বেসিস পয়েন্ট কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বড় বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শুক্রবার প্রকাশিত হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাতের বাইরের কর্মসংস্থানসংক্রান্ত (নন-ফার্ম পেরোলস) গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্টের দিকে গভীরভাবে চোখ রাখছে। এই প্রতিবেদনটি সামনে আসার পরই মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের আগামীর সুদের হার বৃদ্ধির নীতি ও দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
আন্তর্জাতিক বাজার তথ্যদাতা প্রতিষ্ঠান সিএমই ফেডওয়াচের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আগামী ডিসেম্বরে মার্কিন ফেড সুদের হার বাড়াতে পারে বলে জোরালো ধারণা প্রকাশ করেছেন প্রায় ৮২ শতাংশ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী। সুদের হার বৃদ্ধি পেলে বিশ্ববাজারে সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণ নিজের কাছে গচ্ছিত রাখার সুযোগব্যয় (অপরচুনিটি কস্ট) স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়, যা পরোক্ষভাবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণের মূল আকর্ষণ বা আগ্রহ কিছুটা কমিয়ে আনতে পারে।
এসএইচ