পঞ্চম শ্রেণির বইয়ে আবু সাঈদ-মুগ্ধ-ওয়াসিমদের আত্মত্যাগের গল্প 

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম
পঞ্চম শ্রেণির বইয়ে আবু সাঈদ-মুগ্ধ-ওয়াসিমদের আত্মত্যাগের গল্প 

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধিকার ও অধিকার আদায়ের রক্তাক্ত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের পাঠ্যপুস্তকে নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের বীরত্বগাথা এবার স্থান পেয়েছে প্রাথমিক স্তরের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ে।

পঞ্চম শ্রেণির 'আমার বাংলা বই'-এর ২২ নম্বর পাঠে 'আমরা তোমাদের ভুলব না' শীর্ষক রচনায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক শহীদ আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ও ওয়াসিম আকরামসহ অন্যান্য শহীদদের বীরত্ব ও ত্যাগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

পাঠ্যবইয়ের এই বিশেষ রচনায় বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে আত্মদানকারী বীরদের একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা শহীদ তিতুমীর, মাস্টারদা সূর্য সেন ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের সংগ্রামী ইতিহাস দিয়ে আলোচনার সূচনা করা হয়েছে।

এর পরপরই এসেছে ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে জীবন উৎসর্গকারী শহীদ সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বারের স্মৃতি। একই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আসাদ, শহীদ ছাত্র মতিউর রহমান ও তাঁর মা আনোয়ারা বেগম, সার্জেন্ট জহুরুল হক এবং শহীদ অধ্যাপক শামসুজ্জোহার মহান আত্মত্যাগের বিবরণ স্থান পেয়েছে।

১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করার পাশাপাশি স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদ হওয়া স্বাধিকারকামীদের কথাও অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

১৯৮৩ সালের ছাত্র আন্দোলনে শহীদ সেলিম-দেলোয়ার, ১৯৮৭ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বুকে-পিঠে 'স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক' লিখে আত্মদানকারী শহীদ নূর হোসেন এবং ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলনে শহীদ ডা. সামসুল আলম খান মিলন ও শহীদ জেহাদের নাম উল্লেখ করে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়েছে।

ইতিহাসের সেই ধারাবাহিক প্রবাহেই উঠে এসেছে ২০২৪ সালের অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি। গল্পটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে এত দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের পরও এ দেশের মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার ও সমতা পায়নি। বৈষম্যের বিরুদ্ধে ও অধিকার আদায়ের দাবিতে ২০২৪ সালে দেশের শিক্ষার্থীরা পুনরায় রাজপথে নেমে এলে সরকারি বাহিনী তা নির্মমভাবে দমন করার চেষ্টা করে।

এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বুক চিতিয়ে দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে যান। পুলিশের গুলিতে তাঁর শাহাদাতের ঘটনা মুহূর্তেই সারা দেশে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দেয় এবং কোটি মানুষকে রাজপথে নামিয়ে এনে বিশাল গণ-অভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।

একইভাবে রাজপথের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ঢাকার উত্তরায় আন্দোলনকারীদের মাঝে পানি বিতরণের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। চট্টগ্রামে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে প্রাণ দেন শিক্ষার্থী ওয়াসিম আকরাম, যাকে সংগ্রামে অধিকার আদায়ের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ ছাড়া পাঠে স্থান পেয়েছে গোলাম নাফিজ, নাহিয়ানসহ অগণিত প্রাণ ঝরে যাওয়ার কথা, যেখানে অবোধ শিশু থেকে শুরু করে কিশোরদের আত্মত্যাগের বিবরণ রয়েছে।

পাঠ্যবইয়ের এই অংশে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় দেড় হাজারের বেশি মানুষ জীবন দিয়েছেন, অনেকে চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন এবং পঙ্গুত্ববরণ করেছেন।

এই আত্মত্যাগের একমাত্র লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। নতুন প্রজন্মের মনে শহীদদের আদর্শ, দেশপ্রেম ও ইতিহাসচেতনা জাগিয়ে রাখতেই এই ঐতিহাসিক অধ্যায়টি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এসএইচ 

Link copied!