বস্ত্রশিল্পের চাহিদা মেটাতে তুলার উৎপাদন নিয়ে সরকারের বড় পরিকল্পনা

  • নিউজ ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ১১:০৭ এএম
বস্ত্রশিল্পের চাহিদা মেটাতে তুলার উৎপাদন নিয়ে সরকারের বড় পরিকল্পনা

দেশের বস্ত্রশিল্পের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ২০৫০ সালের মধ্যে তুলার উৎপাদন বাড়িয়ে ১৯ লাখ বেলে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বর্তমানে দেশে বছরে ১৬ লাখ বেল তুলার চাহিদার বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে মাত্র ১৮ থেকে ২০ শতাংশ চাহিদা পূরণ হচ্ছে।

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের (সিডিবি) নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন বলেন, ‘দেশের ৫০টিরও বেশি জেলায় তুলার উৎপাদন বাড়াতে আমরা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছি।’

পরিকল্পনা অনুযায়ী, তুলা চাষের জমি বাড়িয়ে দুই লাখ হেক্টরে উন্নীত করার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ লাখ বেল, ২০৪০ সালের মধ্যে ১০ লাখ বেল এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১৯ লাখ বেল আঁশতুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সিডিবি।

মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, চট্টগ্রাম, ফেনী, কক্সবাজার ও নীলফামারী জেলায় তুলা চাষ সম্প্রসারণ করা হবে।

বর্তমানে দেশের ৩৯টি জেলা ও ১৩২টি উপজেলায় উফশী ও পাহাড়ি—উভয় জাতের তুলা চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে ৬৯ শতাংশ জমিতে উফশী এবং ৩১ শতাংশ জমিতে পাহাড়ি তুলা চাষ করা হয়। প্রায় ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে এসব তুলা চাষ করে বছরে প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার বেল আঁশতুলা উৎপাদিত হচ্ছে।

তুলার উৎপাদন বাড়ানোর কর্মসূচির আওতায় উঁচু চরাঞ্চল, বরেন্দ্র অঞ্চল, উপযোগী পাহাড়ি জমি, তুলনামূলক কম উর্বর ও কম উৎপাদনশীল জমি, লবণাক্ততা ও খরাপ্রবণ এলাকা, বিভিন্ন ফলের বাগান, সবজি, ডাল ও মসলার সঙ্গে তুলার আন্তঃফসল চাষ সম্প্রসারণ এবং সরকারি খাসজমি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

এদিকে, গত ১৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতবিনিময় সভায় দেশের তুলা উৎপাদনের সব সম্ভাবনা পর্যালোচনা করে একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা জমা দিতে সিডিবিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া, গত ১৬ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম সভায়ও স্থানীয় তুলা উৎপাদন বাড়ানো এবং বিপুল আমদানি ব্যয় কমাতে সিডিবিকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

স্বাধীনতার পর তুলা চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ

দেশের বস্ত্রশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচা তুলার সংকট মোকাবিলায় তুলা উন্নয়ন বোর্ডের বিশেষজ্ঞরা জানান, স্বাধীনতার পরপরই সিডিবি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর মাঠপর্যায়ে তুলা চাষ পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়। ১৯৭৬ সালে রংপুর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উফশী জাতের ‘ডেল্টাপাইন-১৬’ তুলার চাষ সম্প্রসারণ করা হয়।

১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলাবীজ আমদানির পর তুলা গবেষণা ও সম্প্রসারণ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ সালের ২০ নভেম্বর যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুরে ‘কটন রিসার্চ সেন্টার অ্যান্ড সিড প্রোডাকশন ফার্ম’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সিডিবির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খামারের নাম পরিবর্তন করে ‘কটন রিসার্চ, ট্রেনিং অ্যান্ড সিড মাল্টিপ্লিকেশন ফার্ম’ রাখেন। ১৯৯৪ সালে তিনি গাজীপুরের শ্রীপুরে একটি তুলা খামার উদ্বোধন করেন।

বর্তমানে আধুনিক কৃষিযন্ত্রপাতি সংযোজন ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে ‘কটন রিসার্চ, ট্রেনিং অ্যান্ড সিড মাল্টিপ্লিকেশন ফার্ম’কে একটি আধুনিক তুলা গবেষণা ও বীজ উৎপাদন ইনস্টিটিউটে রূপান্তরের পরিকল্পনা করছে সরকার।

তুলা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগের ফলে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার পাশাপাশি তুলাচাষিদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং বিদেশ থেকে তুলা আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।

জনবল সংকটে উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগ

তুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সিডিবির মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিডিবি সূত্র জানায়, বোর্ডের অনুমোদিত ৮৬৪টি পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ৪৮৩টি পদে জনবল কর্মরত রয়েছেন। বাকি ৩৮১টি পদই শূন্য রয়েছে।

পাট চাষের বিস্তার কমে যাওয়ার পর তুলা দেশের অন্যতম লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সিডিবির মৃত্তিকা পুষ্টি ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. মো. গাজী গোলাম মর্তুজা।

তিনি বলেন, ‘দেশে তুলার মতো এতটা লাভজনক অন্য কোনো ফসল নেই। তাই তুলা উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করা হলে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন এবং কাঁচা তুলা আমদানির পরিমাণও কমবে।’

তুলা চাষের আর্থিক সুবিধা তুলে ধরে সিডিবির বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে তুলা চাষে আনুমানিক ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। বিপরীতে, ওই জমিতে ১৫ মণ (৩৭.৩২ কেজি) কাঁচা তুলা উৎপাদন করে একজন কৃষক প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন।

সিডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, দেশে প্রতি কেজি তুলা উৎপাদনের মাধ্যমে সরকার আমদানি ব্যয়ের চার মার্কিন ডলার সাশ্রয় করতে পারে। জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে তুলার বীজ বপন শুরু হয় এবং ডিসেম্বর মাসে ফসল সংগ্রহ করা হয়।

মাটির উর্বরতা রক্ষায়ও উপকারী তুলা চাষ

তুলা চাষের পরিবেশগত সুবিধা তুলে ধরে সিডিবির জ্যেষ্ঠ জিনিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন বলেন, তুলা চাষ মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায়ও সহায়ক। এটি মাটির উর্বরতা বাড়ায়। অন্যদিকে, একই জমিতে পরপর তিনবার ভুট্টা চাষ করলে মাটির উর্বরতা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।

তবে স্থানীয় তুলা উৎপাদন নিয়ে প্রতিবেদনে চাহিদার আরেকটি হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, দেশের বস্ত্রশিল্পের ব্যাপক চাহিদার বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে ব্যবসায়িক চাহিদার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ পূরণ হয়। এ শিল্পে বছরে আনুমানিক ৭৫ থেকে ৮০ লাখ বেল তুলা প্রয়োজন।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশ থেকে ৭৩ লাখ বেল কাঁচা তুলা ও সুতা আমদানিতে সরকার ৮০ হাজার কোটি টাকা (৬.৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ব্যয় করেছে। সূত্র: বাসস

এম

জাতীয় বিভাগের সাম্প্রতিক খবর

Link copied!